উচ্চশিক্ষা দপ্তর দেখছে… লক্ষ্মীবারে বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে আসছে নয়া বিল। এক রাজ্য এক শিক্ষানীতি, আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় ও অধ্যাপক বদলি নিয়ে বিস্তারিত জানুন।
উচ্চশিক্ষা দপ্তর দেখছে… পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিধানসভার বিশেষ অধিবেশনে পেশ হতে চলেছে রাজ্যের উচ্চশিক্ষার প্রশাসনিক কাঠামো পরিবর্তনের জন্য বহু প্রতীক্ষিত আইন সংশোধনী। ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ অনুষ্ঠিত এই বিশেষ অধিবেশনে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে আনা হচ্ছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ইউনিভার্সিটিজ অ্যান্ড কলেজেস (অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড রেগুলেশন) অ্যামেন্ডমেন্ট বিল ২০২৬’। এই বিলটি পাসের মাধ্যমে সমগ্র পশ্চিমবঙ্গে চালু হতে চলেছে ‘এক রাজ্য, এক শিক্ষাব্যবস্থা’ নীতি।
বিলের মূল লক্ষ্য ও ‘এক রাজ্য, এক শিক্ষাব্যবস্থা’ নীতি
সম্প্রতি নবান্নে আয়োজিত রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই সংশোধনী খসড়া বিলে অনুমোদন দেওয়া হয়। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সাম্প্রতিক বক্তব্যে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, রাজ্যে একই প্রশাসনিক নীতির অধীনে শিক্ষা পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন।
গোলপার্ক থেকে যাদবপুর ৮-বি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত এক রাজনৈতিক কর্মসূচির সমাপনী মঞ্চে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বিলের রূপরেখা ঘোষণা করেন। ইতিমধ্যেই বিলটি বিধানসভায় পেশের পূর্বে প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজ্যপালের ভবনে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হয়েছে।
বিলের অন্যতম প্রধান দিক হলো আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ বদল। ২০০৭ সালে পাশ হওয়া ‘আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় আইন’-এর অধীনে ২০০৮ সালের ৫ এপ্রিল থেকে প্রতিষ্ঠানটি তার যাত্রা শুরু করে। এতদিন এই ঐতিহ্যবাহী বিশ্ববিদ্যালয়টি রাজ্য সরকারের সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তরের অধীনে পরিচালিত হয়ে আসছিল। তবে নতুন সংশোধনী কার্যকর হলে এটি সরাসরি উচ্চশিক্ষা দপ্তরের প্রশাসনিক আওতাভুক্ত হবে।
অধ্যাপক ও শিক্ষাকর্মীদের রাজ্যব্যাপী বদলি নীতি
এই সংশোধনী বিলের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও বিতর্কিত অংশটি হলো বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বদলি (Inter-University Transfer) নীতি। এতদিন পর্যন্ত সরকারি কলেজের শিক্ষকদের পিএসসি (PSC)-র মাধ্যমে এক কলেজ থেকে অন্য কলেজে বদলি করার নিয়ম থাকলেও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের অধ্যাপকদের ক্ষেত্রে এমন কোনও নির্দিষ্ট বিধান ছিল না।
নয়া আইনের অধীনে শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মচারীদের জন্য যে সকল নিয়মাবলী কার্যকর হতে চলেছে:
-
অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তর: কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বা কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পুরনো ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞ অধ্যাপকদের নতুন ও মফস্বলের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে পাঠানোর সুযোগ তৈরি হবে।
-
শিক্ষাকর্মীদের প্রশাসনিক বদলি: বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাজের গতি বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা আনতে অশিক্ষক কর্মচারীদেরও এক বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত করা যাবে।
-
অবকাঠামো উন্নয়ন ও সমান সুযোগ: রাজ্য সরকারের মতে, নবগঠিত বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে অভিজ্ঞ শিক্ষকমণ্ডলী ও দক্ষ কর্মীর অভাব দূর করতেই এই ভারসাম্য বজায় রাখার উদ্যোগ।
প্রশাসনিক ও শিক্ষামহলের প্রতিক্রিয়া এবং প্রশ্নাবলি
সংশোধনী বিলটি প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই রাজ্যজুড়ে শিক্ষামহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন এবং অধ্যাপকদের চাকরির শর্তাবলী নিয়ে একাধিক শিক্ষক সমিতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
| বিষয় | বর্তমান প্রশাসনিক নিয়ম | প্রস্তাবিত নতুন সংশোধনী |
| আলিয়া বিশ্ববিদ্যালয় | সংখ্যালঘু বিষয়ক ও মাদ্রাসা শিক্ষা দপ্তর | সরাসরি উচ্চশিক্ষা দপ্তর |
| অধ্যাপক নিয়োগ ও বদলি | পৃথক বিশ্ববিদ্যালয় ভিত্তিক সার্ভিস রুল | রাজ্যব্যাপী আন্তঃবিশ্ববিদ্যালয় বদলি নীতি |
| শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগ | ক্যাডার বা ক্যাম্পাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ | রাজ্য প্রশাসনিক নির্দেশিকায় সরকারি বদলি নীতি |
ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (CUTA)-র সভাপতি সনাতন চট্টোপাধ্যায় এবং যাদবপুর ইউনিভার্সিটি টিচার্স অ্যাসোসিয়েশন (JUTA)-র প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন যে, স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানের সার্ভিস কন্ডিশন কীভাবে পরিবর্তন হবে সে ব্যাপারে স্পষ্টতার প্রয়োজন। তাঁদের মতে, অধ্যাপকদের ব্যক্তিগত গবেষণা প্রকল্প, ল্যাবরেটরি গ্র্যান্ট এবং স্বায়ত্তশাসনের ওপর এই ব্যবস্থার কী প্রভাব পড়বে তা বিলের চূড়ান্ত খসড়া পেশ হওয়ার পরেই স্পষ্ট হবে।
তবে সরকারি সূত্রে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে, এই পদক্ষেপে উচ্চশিক্ষায় বৈষম্য কমবে এবং সমস্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই গুণগত মানের শিক্ষা পাবে। বিধানসভায় বিলটি পেশ ও আলোচনার পর সমস্ত সামাজিক ও প্রশাসনিক ধোঁয়াশা কেটে যাবে বলে আশা প্রকাশ করা হচ্ছে।
শিক্ষা সম্পর্কিত সরকারি নিয়মাবলি ও নির্দেশিকা জানতে ভিজিট করুন ভারতের শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং পশ্চিমবঙ্গ উচ্চশিক্ষা দফতর-এর অফিশিয়াল পোর্টালে।

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।
