কাশ্মীর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজিত হতে চলেছে ৭-১০ সেপ্টেম্বর। ৪১টি দেশের ১৩৫টি ছবি ও বিশেষ ইভেন্টের মাধ্যমে ভূস্বর্গ ফিরছে আন্তর্জাতিক সিনেমার মানচিত্রে।
কাশ্মীর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব অনুষ্ঠিত হতে চলেছে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর থেকে ১০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। ভূস্বর্গের বুকে এই প্রথমবার আয়োজিত হতে যাওয়া কাশ্মীর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব সমগ্র বিশ্বের সিনেমা প্রেমীদের জন্য এক নতুন দিক খুলে দিচ্ছে। উপত্যকার ইতিহাসে এটি এক অভূতপূর্ব সাংস্কৃতিক মাইলফলক। বহু দশকের রাজনৈতিক ও সামাজিক জটিলতা পেরিয়ে স্বাভাবিক ছন্দে ফেরা কাশ্মীরে এই চলচ্চিত্র মহোৎসব সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণ ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন বার্তা বহন করছে।
কাশ্মীর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব: বিশ্বমানের আয়োজন ও রূপরেখা
জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তর (DIPR) এবং ন্যাশনাল ফিল্ম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের (NFDC) যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এই চার দিনব্যাপী উৎসবে প্রদর্শিত হবে বিশ্বের সেরা সব সিনেমা। আয়োজক কমিটির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের ৮০টিরও বেশি দেশ থেকে প্রায় ১,১০০টি চলচ্চিত্র জমা পড়েছিল। সেখান থেকে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার পর ৪১টি দেশের মোট ১৩৫টি ছবি চূড়ান্ত পর্বে প্রদর্শনের জন্য মনোনীত হয়েছে।
বিশ্ব চলচ্চিত্রের বৈচিত্র্যময় মেলবন্ধন
-
ভারতীয় চলচ্চিত্র বিভাগ (ইন্ডিয়ান প্যানোরামা): ৬৪টি ছবি
-
ফরাসি চলচ্চিত্র (ফ্রান্স): ১৩টি ছবি
-
ইরানি চলচ্চিত্র (ইরান): ৮টি ছবি
-
অন্যান্য আন্তর্জাতিক ছবি: বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে নির্বাচিত আরও ৫০টি সিনেমা।
এই উৎসবে অংশগ্রহণ করছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পরিচালক ও প্রযোজকরা। লেবাননের বিশিষ্ট নির্দেশক সারা ফ্রান্সিস পরিচালিত ছবি ‘ডেড ডগ’ প্রদর্শনের মাধ্যমে উৎসবের শুভ সূচনা হতে চলেছে। আগামী ১০ সেপ্টেম্বর জর্ডানের পরিচালক সোন্দোস আল-সমেয়রাতের ‘সিমসিম’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে চার দিনের সিনেমা উৎসবের পর্দা নামবে।
চলচ্চিত্র জগতের জন্য কেন এই কাশ্মীর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব ঐতিহাসিক?
আশির দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত বলিউড ও ভারতীয় চলচ্চিত্রের প্রধান শুটিং স্পট ছিল কাশ্মীর। ‘কাশ্মীর কি কলি’, ‘আরজু’, ‘জংলি’ থেকে ‘কভি কভি’-র মতো বহু কালজয়ী চলচ্চিত্রের দৃশ্য ধারণ করা হয়েছিল ভূস্বর্গের বৈসরন ও গুলমার্গ উপত্যকায়। পরবর্তীতে অশান্ত পরিস্থিতির কারণে হল সিনেমা হলের দরজা বন্ধ এবং থমকে যায় চলচ্চিত্রের শুটিং।
২০২৩ সালে সফলভাবে অনুষ্ঠিত ‘G20 ট্যুরিজম ওয়ার্কিং গ্রুপ’ মিটিংয়ের পর এবার কাশ্মীর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব উপত্যকাকে আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক মানচিত্রে নতুন স্থানে উন্নীত করছে। এই মহোৎসবে সম্মানিত বিচারক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন অস্কারজয়ী সাউন্ড ডিজাইনার রসুল পুকুট্টি, প্রখ্যাত সিনেমাটোগ্রাফার সন্তোষ সিভান এবং চিত্রপরিচালক ডোরোথি ওয়েনারের মতো বিশ্বমানের ব্যক্তিত্বরা। প্রতিযোগিতামূলক বিভিন্ন বিভাগে মোট ৯৬ লক্ষ টাকার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে।
উৎসবের স্থান ও মূল আকর্ষণ
| ইভেন্টের ধরণ | স্থান ও বিবরণ | মূল আকর্ষণ |
| মূল প্রদর্শনী কেন্দ্র | শের-ই-কাশ্মীর আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার (SKICC) ও INOX শ্রীনগর | উদ্বোধনী ও সমাপনী অনুষ্ঠান, রেড কার্পেট |
| ফ্লোটিং সিনেমা (Floating Cinema) | ডাল লেক, শ্রীনগর | শিকাড়ায় বসে ডাল লেকের জলে ভাসা প্রজেক্টরে পুরনো দিনের চলচ্চিত্র দেখার অনন্য অভিজ্ঞতা |
| বিশেষ আউটরিচ সফর | গুলমার্গ কনভেনশন সেন্টার | আন্তর্জাতিক ডেলিগেট ও লাইন প্রডিউসারদের সঙ্গে বৈঠক ও নেটওয়ার্কিং |
| মাস্টারক্লাস ও ওয়ার্কশপ | SKICC হলসমূহ | সাউন্ড ডিজাইন, চিত্রনাট্য ও সিনেমাটোগ্রাফির উপর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের কর্মশালা |
বিশ্বের লাইন প্রডিউসার ও চলচ্চিত্র প্রতিনিধিদের কাশ্মীরের নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দিতে গুলমার্গে এক বিশেষ ট্যুরের ব্যবস্থা করা হয়েছে। মূল উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে শুটিং গন্তব্য হিসেবে ভূস্বর্গকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরা।
স্থানীয় অর্থনীতি ও তরুণদের নতুন সুযোগ
আয়োজকদের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হলো কান উৎসব (Cannes) কিংবা ভারতের আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের (IFFI) আদলে প্রতি বছর এই কাশ্মীর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন করা।
উপত্যকার উদীয়মান ও তরুণ স্বাধীন নির্মাতাদের উৎসাহিত করতে ‘J&K Select’ শিরোনামে একটি বিশেষ প্রদর্শন বিভাগ রাখা হয়েছে। এটি কাশ্মীরের স্থানীয় অভিনয়শিল্পী, চিত্রনাট্যকার ও কলাকুশলীদের বৈশ্বিক মঞ্চে নিজেদের তুলে ধরার সুবর্ণ সুযোগ সৃষ্টি করবে। পাশাপাশি সিনেমা পর্যটন (Film Tourism), হোটেল ব্যবসা ও স্থানীয় হস্তশিল্প খাতকে এই আয়োজন অর্থনৈতিক গতি দেবে।
উৎসব সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য ও দৈনিক শিডিউল জানতে ভিজিট করুন জম্মু ও কাশ্মীর সরকারের তথ্য ও জনসংযোগ দপ্তর। জাতীয় পর্যায়ের চলচ্চিত্র সংক্রান্ত তথ্যের জন্য পড়ুন National Film Development Corporation (NFDC)।
সমগ্র বিশ্বের সিনেমার মেলবন্ধনে নতুন রূপ পাচ্ছে কাশ্মীর। বারুদের গন্ধ পেছনে ফেলে সেলুলয়েডের আলোয় এক নতুন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভোরের বার্তা দিচ্ছে ভূস্বর্গ।

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।
