Breaking
16 Sep 2026, Wed

মেয়াদের তারিখ বদলে বিক্রি হচ্ছে মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার! ম্যাগি, লে’জ ও লিমকার মতো জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের ভুয়ো গুদামে অভিযান চালাল এফডিএ।

মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার বিক্রি রুখতে চরম সতর্কতা অবলম্বন করা সত্ত্বেও চটজলদি খাদ্যপণ্যের বাজারে থাবা বসিয়েছে এক বিরাট প্রতারণা চক্র। আপনি প্রতিদিন দোকান থেকে যে প্যাকেজড খাবার বা ঠান্ডা পানীয় কিনছেন, তা কি আদৌ নিরাপদ? সম্প্রতি মহারাষ্ট্রে এক চাঞ্চল্যকর জালিয়াতির পর্দাফাঁস করেছে রাজ্য ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) এবং নবি মুম্বই পুলিশের ক্রাইম ব্রাঞ্চ। জানা গিয়েছে, মেয়াদ ফুরিয়ে যাওয়া হাজার হাজার জনপ্রিয় খাদ্যপণ্য নতুন তারিখে প্রিন্ট করে অবাধে বাজারে বিক্রি করা হচ্ছিল।

মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার বিক্রি চক্রের জালে কোন কোন ব্র্যান্ড?

বাজারের সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বহুল বিক্রীত স্ন্যাক্স এবং কোমল পানীয়কে টার্গেট করেছিল এই চক্রটি। তদন্তকারীদের তালিকায় উঠে এসেছে একাধিক নামীদামি ব্র্যান্ড:

  • লে’জ চিপস (Lay’s Chips): বিভিন্ন স্বাদ বা ফ্লেভারের চিপস প্যাকেটের মেয়াদের তারিখ বেআইনিভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে।

  • কুরকুরে (Kurkure): জনপ্রিয় এই ক্রাঞ্চি স্ন্যাকসেরও তারিখ পালটে বাজারে পাঠানো হচ্ছিল।

  • ম্যাগি ও ন’র (Maggi & Knorr): ছোট-বড় সবার প্রিয় ম্যাগি নুডলস এবং ন’রের ইনস্ট্যান্ট স্যুপের প্যাকেটে জালিয়াতি চালানো হয়েছে।

  • সফট ড্রিঙ্কস (Soft Drinks): থামস আপ (Thums Up) এবং লিমকা (Limca)-র মতো রিফ্রেশিং ড্রিঙ্কসের বোতলেও নতুন তারিখ বসিয়ে পুনরায় বাজারে বিক্রি করার প্রমাণ মিলেছে।

দেশজুড়ে এই ব্র্যান্ডগুলির বিপুল চাহিদাকে কাজে লাগিয়েই অসৎ ব্যবসায়ীরা এই বেআইনি কারবার চালাচ্ছিল।

নবি মুম্বইয়ের গুদামে এফডিএ-র মেগা অভিযান

FDA আধিকারিকরা জানিয়েছেন, গত ২৪ থেকে ২৯ আগস্ট পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন ধরে নবি মুম্বইয়ের একটি বিশাল গুদামে চালানো হয় এই সাঁড়াশি অভিযান। তল্লাশি চালিয়ে সেখান থেকে প্রায় ৮,৫০০ কার্টন ভেজাল জিনিস বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে, যার বাজারমূল্য অন্তত ৭৫ লক্ষ টাকারও বেশি।

তদন্তকারী আধিকারিকদের বক্তব্য, এই গুদামটি ছিল একটি বড় সরবরাহ কেন্দ্র। এখান থেকে নিয়মিত মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জেলা, দিল্লি এবং নয়ডাতেও নকল ও তারিখ বদলানো জিনিস পাঠানো হতো।

গুদাম থেকে বাজেয়াপ্ত সামগ্রীর বিবরণ:
├── সামগ্রী: লে'জ, কুরকুরে, ম্যাগি, ন'র স্যুপ, থামস আপ, লিমকা
├── পরিমাণ: ৮,৫০০+ কার্টন
├── আনুমানিক মূল্য: ₹৭৫ লক্ষাধিক
└── মূল সরঞ্জাম: স্টিকার মেশিন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রিন্টার, ভুয়ো লেবেল

যেভাবে পালটে ফেলা হতো মেয়াদের তারিখ

অসাধু ব্যবসায়ীরা এক্সপায়ারি ডেট লুকানোর জন্য অত্যন্ত চতুর প্রযুক্তি ব্যবহার করত। গুদামের ভেতর পাওয়া গেছে আধুনিক প্রিন্টিং মেশিন, রোল করা ভুয়ো লেবেল এবং অসংখ্য তারিখের স্টিকার।

১. প্লাস্টিকের আস্তরণ: প্রথমে প্যাকেটের গায়ে থাকা আসল মেয়াদ উত্তীর্ণের তারিখের উপর একটি পাতলা স্বচ্ছ বা অস্বচ্ছ প্লাস্টিকের আস্তরণ লাগিয়ে দেওয়া হতো।

২. নতুন তারিখের প্রিন্ট: এরপর ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রিন্টারের সাহায্যে নতুন ম্যানুফ্যাকচারিং এবং এক্সপায়ারি ডেট বসানো হতো।

৩. পুনরায় প্যাকেজিং: পুরো প্রক্রিয়াটি এমন নিখুঁতভাবে শেষ হতো যে সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে খালি চোখে তা ধরা প্রায় অসম্ভব ছিল।

তুকারাম মুন্ডের কড়া পদক্ষেপ ও খাদ্য সুরক্ষার ভবিষ্যৎ

মহারাষ্ট্রের খাদ্য সুরক্ষা ব্যবস্থা এবং জনগণের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে বর্তমানে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন এফডিএ কমিশনার তুকারাম মুন্ডে। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই একের পর এক আপসহীন অভিযানে নেমেছেন এই জাঁদরেল আইএএস আধিকারিক।

খাদ্যে ভেজাল মেশানো এবং ভুয়ো ব্যবসার বিরুদ্ধে তিনি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছেন:

  • ভেজাল পনিরের নিষেধাজ্ঞা: রাজ্যজুড়ে মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর নিম্নমানের ও কেমিক্যালযুক্ত ভেজাল পনির বিক্রি বন্ধ করা হয়েছে।

  • নামীদামি আউটলেটের লাইসেন্স বাতিল: স্বাস্থ্যবিধি না মানায় ডমিনোজ, পিজ্জা হাটের মতো আন্তর্জাতিক চেইন শপের লাইসেন্স বাতিল বা কারণ দর্শানোর নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

  • মহাপ্রসাদ ও হোটেল নির্দেশিকা: বড় বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মহাপ্রসাদ বিতরণ কেন্দ্রগুলির জন্যও লাইসেন্স বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

  • খোলা ভোজ্য তেল বিক্রি বন্ধ: জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খোলা তেল বিক্রির উপর আইনি নিষেধাজ্ঞা কড়াকড়িভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে।

তুকারাম মুন্ডের এই মেগা স্ট্রাইকের পর নবি মুম্বইয়ের গুদামে ভুয়ো চক্রের পর্দাফাঁস হওয়ায় ভেজালকারীদের ঘুম উড়েছে। যদিও এখনও পর্যন্ত কাউকেও গ্রেপ্তার করা যায়নি, তবে পলাতক মালিক ও চক্রের প্রধানদের সন্ধানে পুলিশ তল্লাশি চালাচ্ছে।

ক্রেতাদের জন্য সতর্কতা ও খাদ্য সুরক্ষা সম্পর্কিত নির্দেশিকা

এই ধরনের ভুয়ো চক্র থেকে বাঁচতে ক্রেতাদের নিজেদেরও কিছু বিষয়ে সতর্ক হতে হবে। যেকোনো খাদ্যদ্রব্য কেনার আগে ভারতের ফুড সেফটি অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অথরিটি অফ ইন্ডিয়া (FSSAI)-এর নির্দেশিকা মেনে চলা উচিত।

  • প্যাকেটের তারিখ ডাবল-চেক করুন: প্রিন্ট করা তারিখের উপর কোনো অতিরিক্ত প্লাস্টিকের লেবেল বা স্টিকার বসানো আছে কিনা ভালো করে দেখুন।

  • কোড ও প্যাকেজিং স্পট: প্রিন্টের লেখা ঝাপসা হলে বা ওভার-প্রিন্টিংয়ের চিহ্ন থাকলে সেই পণ্যটি কেনা থেকে বিরত থাকুন।

  • অফিসিয়াল পোর্টালে অভিযোগ: খাদ্যে ভেজাল বা মেয়াদ উত্তীর্ণ খাবার বিক্রি করার সন্দেহ হলে FSSAI-এর ফুড সেফটি কানেক্ট পোর্টালে সরাসরি অভিযোগ দায়ের করুন।

By Tanmay

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।

Leave a Reply

Enable Notifications No Allow