চিনির দাম কমাতে কড়া সিদ্ধান্ত নিল কেন্দ্র। উৎসবের মরশুমে মজুতদারি রুখতে নয়া নির্দেশিকা মোদি সরকারের। পড়ুন প্রাইম ইনসাইটস-এর বিশেষ প্রতিবেদন।
চিনির দাম হু হু করে বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কায় গোটা দেশজুড়ে বড়সড় উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। গোটা বিশ্বে চিনির চাহিদা সবচেয়ে বেশি ভারতেই। তাছাড়া সামনেই আসছে বড় বড় উৎসবের মরশুম। দুর্গাপুজো, ধনতেরাস, দিওয়ালির মতো আনন্দানুষ্ঠানে দেশে খাদ্য সামগ্রী এবং মিষ্টির ব্যবহার একলাফে অনেকটাই বেড়ে যায়। ঠিক এই সময় বাজারে যদি চিনির দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যায়, তবে তার প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়বে সামগ্রিক খুচরো বাজারে ও মূল্যস্ফীতিতে। এই পরিস্থিতিতে বাজার দর নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং বাজারে সার্বিক জোগান স্বাভাবিক রাখতে বড়সড় সিদ্ধান্তের পথে কেন্দ্রের নরেন্দ্র মোদি সরকার।
শুধু বিদেশ থেকে আমদানি নয়, বাজারে চিনির দাম কমাতে এবং কৃত্রিম সংকট তৈরি করে অসাধু ব্যবসায়ীরা যাতে ফায়দা তুলতে না পারে, তার জন্য সরকার মজুতদারি কড়া হাতে রুখতে চাইছে। PrimeInsight.in-এর বিশেষ পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কেন্দ্রের নয়া নির্দেশ মেনে বড় বড় চিনি ব্যবসায়ী বা মজুতদাররা ১৫ দিনের বেশি চিনি গুদামে আটকে রাখতে পারবেন না।
মজুতদারদের ওপর কড়া বিধিনিষেধ
মোদি সরকারের নয়া নির্দেশিকা বলছে, যে সব ব্যবসায়ীরা মাসে ১০ মেট্রিক টনের বেশি চিনি বেচাকেনা করেন, তাঁদের প্রতি ১৫ দিনের মধ্যে নিজেদের গুদামে মজুত সব চিনি বাজারে ছাড়তে হবে। অর্থাৎ, ব্যবসা চালু রাখতে তারা ১৫ দিনের বেশি পরিমাণের চিনি কখনোই জমিয়ে রাখতে পারবেন না। সেটা নিশ্চিত করতে ১৫ দিন অন্তর অন্তর কঠোর অভিযান চালাবে সরকার। আগামী ১ সেপ্টেম্বর থেকে এই বিধিনিষেধ চালু হবে। সেটা চলবে ৩০ নভেম্বর অর্থাৎ উৎসবের মরশুম শেষ হওয়া পর্যন্ত।
১০ বছর পর চিনি আমদানির নজিরবিহীন পরিকল্পনা
আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের সূত্র তুলে ধরে PrimeInsight.in জানাচ্ছে, দেশের বাজারে চিনির সংকট মেটাতে এবং চিনির দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যত নজিরবিহীন পদক্ষেপের পথে সরকার। প্রায় ১০ বছর বাদে বিদেশ থেকে বিপুল পরিমাণ চিনি আমদানি করতে পারে ভারত। চমকপ্রদ বিষয় হলো, চিনি উৎপাদনে এতদিন যে ভারত শুধু স্বাবলম্বী ছিল তাই নয়, প্রতি বছর বড় অঙ্কের চিনি রপ্তানিও করত। কিন্তু এ বছর ইথানল উৎপাদনের জোরাল ধাক্কায় এতটাই অভূতপূর্ব সংকটের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে বিদেশ থেকে প্রচুর চিনি আমদানির কথা ভাবতে হচ্ছে।
কেন তৈরি হলো এই অভূতপূর্ব সংকট?
এ বছর চিনির দাম যে বাড়তে পারে সে আশঙ্কা আগেই ছিল। বর্ষা অনিয়মিত হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আখের উৎপাদন কিছুটা মার খেয়েছে। সমস্যা হলো, আখের উৎপাদন কম হওয়ার পাশাপাশি ইথানল কারখানায় আখের ব্যাপক চাহিদা বৃদ্ধি। দেশে পেট্রোলের ওপর নির্ভরতা কমাতে এবং পরিবেশবান্ধব জ্বালানির সরবরাহ বাড়াতে গত কয়েক বছরে ইথানল ফ্যাক্টরি বাড়াতে বিশেষ উৎসাহ দিয়েছে কেন্দ্র।
ইথানল তৈরিতে প্রায় ৩০-৩৫ শতাংশ আখের রস প্রয়োজন হয়। বিপুল চাহিদা মেটাতে এই ইথানল কারখানাগুলি কৃষকদের কাছে কিছুটা বেশি দামে সরাসরি আখ কিনে নিচ্ছে। যার ফলশ্রুতিতে এই মুহূর্তে চিনি মিলগুলিতে আখের সরবরাহ কমছে, যার কারণে স্বাভাবিকভাবেই চিনি উৎপাদন মার খাচ্ছে। একদিকে কারখানায় আখের টান, অন্যদিকে বাজারের ঊর্ধ্বমুখী চাহিদা—এই দুইয়ের চাপে বাজারে পর্যাপ্ত চিনি মিলছে না এবং অবধারিতভাবে লাফিয়ে বাড়ছে চিনির দাম।
সার্বিক অর্থনীতি ও মিষ্টি ব্যবসায়ীদের বড় ধাক্কা
আসলে গোটা বিশ্বে চিনির জোগান ও চাহিদার হিসেবে ভারত শীর্ষস্থানে রয়েছে। এখন থেকে যদি বাজারে চিনির দাম ঠিকমতো নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে আগামী দিনে সাধারণ মানুষের পকেটে বড় টান পড়বে। চিনির দাম বাড়লে কেবল রান্নাবান্নার খরচই বাড়বে না, বরং বেকারির খাবার থেকে শুরু করে অন্যান্য বহু খাদ্যসামগ্রীর উৎপাদন খরচও একধাক্কায় বেড়ে যাবে। সবচেয়ে বড় সমস্যায় পড়তে পারেন ছোট ও বড় মিষ্টি ব্যবসায়ীরা। দুর্গাপুজো এবং দিওয়ালির মতো উৎসবে মিষ্টির বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়, কিন্তু কাঁচামালের আকাশছোঁয়া দাম ব্যবসায়িক মুনাফায় বড়সড় ধাক্কা দিতে পারে।
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে PrimeInsight.in নিশ্চিত করেছে যে, কেন্দ্রের এই কড়া পদক্ষেপ এবং মজুতবিরোধী অভিযান যদি ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে উৎসবের মুখে চিনির দাম কিছুটা হলেও সহনশীল মাত্রায় থাকবে।

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।
