ফ্লাইদুবাই বিমানে ককপিটে হামলা চালিয়েছিল কো-পাইলট। মাঝআকাশে জীবন বাজি রেখে যাত্রীদের রক্ষা করলেন বীর ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর। পড়ুন সম্পূর্ণ খবর।
প্রাইম ইনসাইট ডিজিটাল ডেস্ক: মাঝআকাশে ফ্লাইদুবাই বিমানে ককপিটে হামলা চালানোর এক নজিরবিহীন ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাই (Flydubai) বিমানের ককপিটে ঠিক কী ঘটেছিল, এবং কীভাবে জীবন বাজি রেখে ১৭৪ জন যাত্রীর প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল—তার রোমহর্ষক বিবরণ এবার সামনে এলো। শনিবার ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সরাসরি দূরভাষে কথা বলেন ওই বিমানের বীর ভারতীয় ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের সঙ্গে। পরবর্তীতে ইজরায়েল প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে প্রকাশিত একটি সরকারি ভিডিও ও ফোনালাপের মাধ্যমে মাঝআকাশের সেই ভয়ানক অভিজ্ঞতার কথা বিশ্ববাসী জানতে পারে।
নমাজের অছিলায় পিছন থেকে এলোপাথাড়ি মার
ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরশাহীর ফ্লাইদুবাই পরিচালিত FZ1073 বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স ৮ বিমানটি যখন প্রায় ৩৪ হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থান করছিল, তখন পরিস্থিতি সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ছিল। স্মিতের পাশাপাশি ককপিটে কো-পাইলট হিসেবে কর্মরত ছিলেন ওমানের নাগরিক হামাম আল-হামামি। উড্ডয়ন চলাকালেই কো-পাইলট জানায়, সে কিছুক্ষণের জন্য প্রার্থনা বা নমাজ পড়তে চায়। সাধারণত দীর্ঘ উড়ানে পাইলটদের প্রার্থনা করা অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা, তাই স্মিত তাতে সম্মতি জানান এবং বিমানের সামনের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে নজর দেন।
কিন্তু প্রার্থনা করার অছিলায় ককপিটের পিছনের অংশে গিয়ে মুহূর্তের মধ্যে আচমকা আক্রমণ চালায় ওই কো-পাইলট। স্মিত মচ্ছর জানান, “আমি তখন সামনের কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে তাকিয়ে বিমান পরিচালনা করছিলাম। হঠাৎই মাথার পিছন থেকে প্রচণ্ড জোরে একটি ধাক্কা আসে। প্রথমে ভেবেছিলাম বিমানে হয়তো কোনো বড়সড় যান্ত্রিক ত্রুটি হয়েছে অথবা প্রচণ্ড এয়ার ট্র্যাফিক বা টার্বুলেন্সের ঝাঁকুনিতে মাথা আঘাত পেয়েছে। কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরপর এলোপাথাড়ি মার পড়তে শুরু করে। তখনই বুঝতে পারি, এটি কোনো স্বাভাবিক বিমান দুর্ঘটনা নয়—বরং ককপিটের ভেতরে কো-পাইলট নিজেই হামলা চালিয়েছে।”
রক্তে ভেসে যাচ্ছিল মুখ, দ্রুত নিচে নামছিল বিমান
হামলার তীব্রতায় ক্যাপ্টেন স্মিত গুরুতর আহত হন। ক্রমাগত শারীরিক প্রহারে তাঁর মুখের রক্তে চোখ ঝাপসা হয়ে আসতে শুরু করে। তবুও অসীম সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তিনি সেই অবস্থাতেই আক্রমণ প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে যান। এই ধস্তাধস্তির মাঝেই বিমানটি তার স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়ে দ্রুত গতিতে নিচের দিকে নামতে থাকে। অ্যাভিয়েশন ট্র্যাকারের তথ্য অনুযায়ী, বিমানটি মাত্র ২৯ সেকেন্ডের মধ্যে প্রায় ১৪,০০০ ফুট নিচে নেমে যায় এবং আন্তর্জাতিক এভিয়েশন সিস্টেমে জরুরি সংকেত ‘Transponder Code 7500’ (বিমানে হামলা বা হাইজ্যাকিং নির্দেশক) সক্রিয় হয়ে ওঠে।
ক্যাপ্টেন স্মিত স্মরনে আনেন, “রক্ত জমাট বেঁধে আমার দৃষ্টিশক্তি তখন প্রায় শূন্যে পৌঁছে গিয়েছিল। বাইরে বিমানের যাত্রীরাও বিপদের আঁচ পেয়ে আর্তচিৎকার করছিলেন। আমি জানতাম, এই অবস্থায় যদি ককপিটের নিয়ন্ত্রণ ফিরে না পাওয়া যায়, তবে বিমানের সকল যাত্রীই মৃত্যুমুখে পতিত হবেন। আমি ককপিটের দরজাটা একবার খোলার চেষ্টা করি, কিন্তু কো-পাইলট তা আবার বন্ধ করে দেয়। এরপর শেষ অবশিষ্ট সমস্ত মানসিক ও শারীরিক শক্তি একত্রিত করে আমি আবার দরজাটা সম্পূর্ণ খুলে দিতে সক্ষম হই।”
যাত্রীদের সাহসিকতা ও জরুরি ল্যান্ডিং
ফ্লাইদুবাই বিমানে ককপিটে হামলা চলার আওয়াজ পেয়ে বিমানের দরজার বাইরে আগেই সতর্ক হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কয়েকজন যাত্রী। স্মিত কোনোমতে ককপিটের দরজা খুলতেই ভেতরে প্রবেশ করেন একাধিক ইজরায়েলি যাত্রী এবং বিমানে অফ-ডিউটিতে সফররত অন্য এক এয়ারলাইন্সের পাইলট। তাঁরা দ্রুত হামলাকারী ওমানি কো-পাইলটকে ধরে ফেলেন ও কাবু করেন। পরবর্তীতে অফ-ডিউটি পাইলট বিমানের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেন এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে বিমানটিকে সৌদি আরবের তাবুক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করান।
ক্যাপ্টেন স্মিত মচ্ছর বর্তমানে আবু ধাবির একটি উচ্চমানের হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁর আঘাত গুরুতর হলেও বর্তমানে অবস্থা স্থিতিশীল। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও ইজরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু উভয়েই ফোনে কথা বলে ক্যাপ্টেন স্মিতের সাহসিকতার ভূয়সী প্রশংসা করেছেন। নেতানিয়াহু তাঁকে ‘প্রকৃত আন্তর্জাতিক বীর’ বলে অভিহিত করেন এবং ইজরায়েলের আসন্ন স্বাধীনতা দিবস উদযাপনে বিশেষ রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। আন্তর্জাতিক তদন্তকারী সংস্থাগুলি ইতিমধ্যেই এই ঘটনার পেছনে কোনো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের ইন্ধন রয়েছে কি না, তা নিয়ে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত শুরু করেছে।

ইন্দ্রজিৎ ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।