মেয়ো রোডে টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবস পালনের সভার অনুমতি নিয়ে জট। কলকাতা হাই কোর্টে মুখোমুখি কালীঘাট ও ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল।
মেয়ো রোডে টিএমসিপির প্রতিষ্ঠা দিবস উদযাপন করাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতির দুই বিরোধী মেরু— কালীঘাটপন্থী তৃণমূল এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন ‘আসল’ তৃণমূলের মধ্যে সংঘাত চরম আকার ধারণ করেছে। প্রতি বছর ২৮ আগস্ট কলকাতার ঐতিহ্যবাহী মেয়ো রোডে গান্ধী মূর্তির পাদদেশে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে বিশাল জনসভার আয়োজন করা হয়ে থাকে, যেখানে মূল বক্তা হিসেবে ভাষণ দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে চলতি বছরের পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই কর্মসূচি আয়োজন করা নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র জটিলতা। একই দিনে একই সময়ে মেয়ো রোডের একই স্থানে সভার অনুমতি চেয়ে কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে দুই পৃথক গোষ্ঠী।
পুলিশের তরফ থেকে সময়মতো কোনো সাড়া না মেলায় সোমবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চে মামলাটির দ্রুত শুনানির আর্জি জানান কালীঘাট শিবিরের আইনজীবীরা। আদালত সেই আর্জি গ্রহণ করে জানিয়েছে, মঙ্গলবারই এই সংক্রান্ত জটিল মামলার শুনানি সম্পন্ন করা হবে।
পুলিশি অনুমতির বিলম্ব ও জরুরি আবেদনের পটভূমি
ঐতিহ্যগতভাবে প্রতি বছর আগস্টের শেষে মেয়ো রোডেই ছাত্র সংগঠনের মূল কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হলেও, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক সমীকরণের রদবদলে পরিস্থিতির মোড় ঘুরে গিয়েছে।
কালীঘাট পন্থীদের পক্ষে মামলা লড়া আইনজীবী অর্ককুমার নাগ আদালতে অভিযোগ করেন যে, আগামী ২৮ আগস্ট মেয়ো রোডে কর্মসূচির অনুমতি চেয়ে গত ২৭ জুলাই কলকাতা পুলিশকে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়েছিল। এর পর ৩ আগস্ট এবং ৭ আগস্ট পর পর দুটি চিঠি পাঠিয়ে আবেদনের স্থিতি জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু লালবাজার পুলিশ সদর দপ্তর বা স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো স্পষ্ট জবাব না আসায় আইনি নিরাপত্তার স্বার্থে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছে তৃণমূলের এই দল।
‘আসল’ তৃণমূলের পাল্টা পিটিশন ও স্থান দখলের লড়াই
অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন নতুন গোষ্ঠীও আদালতের নজর এড়িয়ে যায়নি। নিজেদের ‘আসল তৃণমূল ছাত্র পরিষদ’ বলে দাবি করে সুদীপ রাহাও গান্ধী মূর্তির পাদদেশে ওই একই তারিখে সভা করার অনুমতি চেয়ে আবেদন দাখিল করেছেন।
সুদীপ রাহার দাখিল করা পিটিশনে আরও দাবি করা হয়েছে, তাঁদের সংগঠনই মূল ছাত্র পরিষদ; সুতরাং তৃণমূল ছাত্র পরিষদের নাম ভাঙিয়ে অন্য কোনো পক্ষ যদি মেয়ো রোডে সভা করার আবেদন জানিয়ে থাকে, তবে তা যেন অবিলম্বে নাকচ করে দেওয়া হয়। এই দ্বিমুখী আবেদনের কারণে মেয়ো রোডের সভা ঘিরে আইনি প্যাঁচ আরও শক্ত হয়েছে।
রাজনৈতিক বিভাজন ও আদালতের মধ্যস্থতা
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তীতে ঘাসফুল শিবিরে দেখা দেওয়া বড়সড় ভাঙনের পর এটিই প্রথম বড় ছাত্র সভা। এর আগে ২১ জুলাইয়ের শহিদ দিবস উদযাপন নিয়েও ধর্মতলা বনাম ক্যাথিড্রাল রোড কেন্দ্রিক একই ধরনের প্রশাসনিক ও আইনি লড়াই দেখা গিয়েছিল, যেখানে আদালত দুই দলকে দুটি ভিন্ন স্থানে নির্দিষ্ট শর্তসাপেক্ষে সভা করার নির্দেশ দিয়েছিল।
এখন প্রশ্ন উঠছে, ছাত্র পরিষদের প্রতিষ্ঠা দিবসের ক্ষেত্রে কি হাইকোর্ট দুই শিবিরকে ভিন্ন সময় বা বিকল্প কোনো স্থানে সভা করার নির্দেশ দেবে, নাকি ঐতিহাসিক এই ময়দান কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষের দখলে যাবে? মঙ্গলবারের এজলাসে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের চূড়ান্ত নির্দেশের ওপরই ঝুলে রয়েছে রাজ্য রাজনীতির এই নতুন অধ্যায়।

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।
