Breaking
16 Sep 2026, Wed

নেপাল বিপর্যয়: তিব্বতে হিমবাহ ধসে প্রলয়ঙ্কারি হড়পা বান, নিখোঁজ শত শত ভারতীয়, আশঙ্কায় কলকাতা

নেপাল বিপর্যয় ও হড়পা বান

নেপাল বিপর্যয় ও তিব্বতে হিমবাহ ধসে ভয়াবহ হড়পা বান। ভোতেকোশি নদীর তোড়ে ছারখার একাধিক শহর। কলকাতার ৩২ জনসহ নিখোঁজ শত শত ভারতীয় পর্যটক। জানুন এই বিপর্যয়ের বৈজ্ঞানিক কারণ।

পার্বত্য দেশ নেপাল (Nepal) পুনরায় এক অভূতপূর্ব প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে। চিনের তিব্বত সীমান্তে আকস্মিক বিপর্যয়ের পর প্রলয়ঙ্কারি হড়পা বানের (Flash Flood) তোড়ে ভেসে গিয়েছে একের পর এক জনপদ। ধেয়ে আসা কাদা, বরফ ও পাথরের স্রোত মুহূর্তের মধ্যে স্তূপীকৃত ধ্বংসাবশেষে পরিণত করেছে নেপালের পাহাড়ি গ্রাম ও শহরগুলিকে। ভয়াবহ এই নেপাল বিপর্যয়-এর জেরে শুধু যে স্থানীয় বাসিন্দারাই গৃহহীন হয়েছেন তা নয়, কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রায় গিয়ে প্রাণসঙ্কটে পড়েছেন ৩০০-র বেশি ভারতীয় তীর্থযাত্রী। যার মধ্যে খাস কলকাতার ৩২ জন পর্যটকের সন্ধান মিলছে না।

কেন এই প্রলয়? নেপাল বিপর্যয়ের নেপথ্যে বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যা

হঠাৎ করে ভোতেকোশি নদীতে কীভাবে নামল এই দানবীয় জলোচ্ছ্বাস? ভূবিজ্ঞানী ও আবহাওয়াবিদদের মতে, এই বিধ্বংসী ঘটনার নেপথ্যে কাজ করেছে পরপর কয়েকটি ভৌগোলিক ঘটনা:

  • তিব্বতে প্রবল বৃষ্টি ও ভূ-কম্পন: তিব্বত অঞ্চলে কয়েক দিন ধরে চলা মুষলধারে বৃষ্টির মাঝেই ভোরে হঠাৎ তীব্র ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

  • বিশালাকার হিমবাহ ধস (Glacier Avalanche): কম্পনের ঝাঁকুনিতে তিব্বতের পাহাড়ের চূড়া থেকে একটি বিশালাকার হিমবাহ ভেঙে পড়ে স্তূপীকৃত হয় লেন্দে নদীর (Lende River) বুকে। নদীর স্বাভাবিক জলপ্রবাহ সম্পূর্ণ অবরুদ্ধ হয়ে একটি বিশাল কৃত্রিম জলাধার তৈরি হয়।

  • জিএলওএফ (GLOF) বা জলাধার বিস্ফোরণ: জলের প্রচণ্ড চাপে সেই অস্থায়ী বরফের বাঁধ হঠাৎ ভেঙে যায়। বিজ্ঞানের পরিভাষায় একে বলা হয় Glacial Lake Outburst Flood (GLOF)

  • ভোতেকোশির প্রলয় রূপ: এই বিপুল জলরাশি প্রচণ্ড গতিতে পাহাড়ি ঢাল বেয়ে নেমে এসে নেপালের ভোতেকোশি নদীতে (Bhote Koshi River) আছড়ে পড়ে। চোখের নিমেষে নদীর জলস্তর প্রায় ৯ মিটার বৃদ্ধি পেয়ে দু’কূল ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

মৃত ও নিখোঁজের পরিসংখ্যান (Latest Updates)

বিপর্যয় কবলিত এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিবরণ বর্তমান পরিস্থিতি
নিশ্চিত মৃতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়েছে (ক্রমবর্ধমান)
মোট নিখোঁজের আশঙ্কা প্রায় ১,৫০০ জন
নিখোঁজ/আটকে পড়া ভারতীয় ৩০০ থেকে ৪০০ জন
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা রসুয়াগধি, তিমুরে ও নুয়াকোট

উৎকণ্ঠায় বাংলা: কলকাতার ৩২ জনসহ বহু পর্যটকের হদিশ নেই

এই প্রাকৃতিক দুর্যোগের জেরে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন পশ্চিমবঙ্গের বহু পরিবার।

  1. কলকাতার পর্যটক দল: কলকাতার হো চি মিন সরণির ‘চলো যাই’ ট্রাভেল ক্লাবের মাধ্যমে মানস সরোবর যাত্রায় গিয়েছিলেন ৩২ জন পর্যটক। রসুয়াগধি সীমান্ত পার করার পরই তাঁদের সঙ্গে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। এই দলে ১৮ জন মহিলা ও ১৪ জন পুরুষ রয়েছেন, যাঁদের গড় বয়স ৫৮ বছর।

  2. ব্যর্থ উদ্ধারকপ্টার: ট্রাভেল এজেন্সির তরফে নিখোঁজ এলাকায় উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার পাঠানো হলেও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ও ঘন মেঘের কারণে তা নামতে পারেনি।

  3. অন্যান্য দল ও স্বস্তি: চিনের ইমিগ্রেশন ও তিমুরে এলাকায় ইশা ফাউন্ডেশনের ৭৭ জন সদস্য আটকে রয়েছেন। তবে স্বস্তির খবর, আরামবাগ থেকে যাওয়া ৬৫ জন পর্যটকের দলটি মূল বিপদসীমা থেকে ১২০ কিলোমিটার দূরে চেতনপার্কে সুরক্ষিত রয়েছেন।

যুদ্ধকালীন তৎপরতায় উদ্ধারকাজ ও হেল্পলাইন

ঘটনার পর থেকেই নেপালি সেনা (Nepal Army) এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী দুর্গম এলাকায় উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের পরিস্থিতি সামাল দিতে রাজ্য সরকারের নবান্ন ও ভবানী ভবনে বিশেষ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী পরিস্থিতির দিকে নজর রাখছেন। পরিজনদের সহায়তার জন্য জরুরি হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে:

  • রাজ্য কন্ট্রোল রুম (নবান্ন): 033-24793311 / 9147890181

  • ভারতীয় দূতাবাস (কাঠমান্ডু): +977 985 131 6807

ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক (MEA) ও ভারতীয় দূতাবাস কাঠমান্ডু প্রশাসনের সঙ্গে প্রতিনিয়ত সমন্বয় রক্ষা করে চলেছে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও হিমালয় অঞ্চলের ভবিষ্যৎ

২০১৫ সালের বিনাশকারী ভূমিকম্পের পর ফের এত বড় বিপর্যয়ের মুখোমুখি নেপাল। পরিবেশবিদদের মতে, বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming) ও জলবায়ু পরিবর্তনের চরম প্রভাব পড়ছে হিমালয় অঞ্চলে। দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া এবং অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে এই এলাকাগুলি ভূ-সংবেদনশীল হয়ে উঠছে, যা আগামী দিনে আরও বড় বিপদের বার্তা দিচ্ছে।

By Tanmay

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।

Leave a Reply

Enable Notifications No Allow