নেপাল হিমবাহ ধস (Nepal Flash Flood) ও ভয়াল বন্যার নেপথ্যে চাঞ্চল্যকর তথ্য। ২০০০ ফুট চওড়া হিমবাহের টুকরো খসে পড়তেই ভূমকম্প ও ‘জলবোমা’। কীভাবে ধ্বংস হলো নেপাল? জানুন বিস্তারিত।
কাথমণ্ডু: কোনো মেঘভাঙা বৃষ্টি নেই, ভাদ্রের নীল আকাশের নীচে হুট করেই নেমে এলো কেয়ামতের বিপর্যয়! চারিদিকে শোরগোল, আতঙ্কের চিৎকার আর চোখের পলকে সবকিছু তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে স্তব্ধ পুরো বিশ্ব। প্রশ্ন উঠছিল, বৃষ্টি ছাড়া এত বিপুল জলরাশি এল কোত্থেকে? নেপালের এই সাম্প্রতিক ভয়াল ট্র্যাজেডির নেপথ্যে উঠে আসছে একের পর এক বিস্ফোরক তথ্য। ড্রোনের ছবি এবং উপগ্রহ চিত্রে স্পষ্ট, এই নেপাল হিমবাহ ধস (Nepal Flash Flood) কোনো সাধারণ বিপর্যয় নয়; এটি ছিল এক বিশাল প্রকৃতির তাণ্ডব এবং মানুষের ভুলের সম্মিলিত ফল।
ভূমিকম্প নাকি হিমবাহ ধসের ওজন?
শুরুতে মনে করা হয়েছিল, বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটের ৪.৪ মাত্রার ভূমিকম্পের কারণেই বোধহয় পাহাড় কেঁপে উঠে হিমবাহের টুকরো ভেঙে পড়েছে। কিন্তু পরবর্তীতে মার্কিন ভূতত্ত্ব সর্বেক্ষণ (USGS) জানায়, কোনো প্রথাগত ভূমিকম্পের কারণে এই ঘটনা ঘটেনি। বরং ৫.২ মাত্রার যে তীব্র কম্পন রেকর্ড করা হয়েছে, তা আসলে বিশাল আকারের নেপাল হিমবাহ ধস-এর প্রচণ্ড ওজনের আঘাতেই তৈরি হয়েছিল!
ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত ভূবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল শুগার উপগ্রহ চিত্র বিশ্লেষণ করে জানান, ২০০০ ফুট চওড়া একটি বিশাল হিমবাহের টুকরো প্রায় ৪০০০ ফুট নীচে সটান আছড়ে পড়ে। পুরো ঘটনাটি ঘটেছে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৭০০০ ফুট উঁচুতে। অর্থাৎ, ১৭ হাজার ফুট উঁচুতে থাকা মূল হিমবাহ থেকে বিশালাকার টুকরোটি খসে পড়ে ১৩ হাজার ফুট উঁচুতে। উপত্যকার বুকে এই পতন ছিল যেন এক একটি মিসাইল বা পারমাণবিক ‘বম্বিং’-এর সমান।
যেভাবে রূপ নিল ভয়াল ‘জলবোমা’য়
বিজ্ঞানী শুগারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ওই বিশালাকার বরফের টুকরোটি তিব্বতের লেন্ডে নদীতে আছড়ে পড়ার সাথে সাথেই কাদা, বরফ, পাথর ও বিশাল বোল্ডার মিশে এক ভয়ঙ্কর ‘জলবোমা’র সৃষ্টি করে। পাহাড়ি নদীর খাড়া ঢাল হওয়ার কারণে এই বিপুল পরিমাণ কাদাজল ও বরফের প্রবাহ দু’কুল ধ্বংস করতে করতে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে নীচের দিকে নামতে থাকে।
‘ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট’ (ICIMOD)-এর পরিবেশবিজ্ঞানীরা জানান, নেপালের গালচির কাছে মাত্র ৩০ মিনিটে ত্রিশূলি নদীর জলস্তর অবিশ্বাস্যভাবে ৯ মিটার (প্রায় ৩০ ফুট) বেড়ে যায়! অন্যদিকে মালেখুর কাছে মাত্র আধা ঘণ্টায় জলস্তর বাড়ে অন্তত ৭ মিটার। নদীর এই অনিয়ন্ত্রিত রূপ নদীপাড়ের মানুষজনকে প্রাণ বাঁচিয়ে পালানোর বিন্দুমাত্র সময় দেয়নি। আশঙ্কা করা হচ্ছে, কয়েক হাজার মানুষ এই ধ্বংসস্তূপ ও কাদার নীচে চাপা পড়েছেন।
মানুষের ভুল এবং ‘প্রাকৃতিক বিপর্যয়’
এই নেপাল হিমবাহ ধস-এর নেপথ্যে কি শুধু প্রকৃতি দায়ী, নাকি মানুষের অসচেতনতাও সমানভাবে অপরাধী? পরিবেশবিজ্ঞানীরা ৩টি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন:
-
বিশ্ব উষ্ণায়ন (Global Warming): অনিয়ন্ত্রিতভাবে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের বরফ গলছে এবং হিমবাহ দুর্বল হয়ে পড়ছে। পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সাফ জানিয়েছেন, এর পেছনে মানুষের কর্মকাণ্ডই প্রধানত দায়ী।
-
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাঁধ: পাহাড়ি অঞ্চলে অতিরিক্ত বাঁধ নির্মাণ নদীগুলির জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নেপালের পাহাড়ি পথে ২০টি সেতুর পাশাপাশি ১৩টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প এই বন্যায় ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গেছে। এর অনেকগুলিতেই বাঁধ দিয়ে জল জমানো ছিল। বাঁধ ভাঙার ফলে সেই জল ‘জলবোমা’র তেজ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। ২০২১ সালে ভারতের চামোলি বিপর্যয় কিংবা ২০২৩ সালের সিকিমে চুংথাং প্রকল্প ধ্বংসের নেপথ্যেও ঠিক একই কারণ ছিল।
-
নদীখাতে বেআইনি নির্মাণ: নদী প্লাবনভূমি দখল করে হোটেল, বহুতল ও আবাসন তৈরি করা হয়েছিল। প্লাবনভূমি ফাঁকা থাকলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কম হতো।
সামনে আরও বিপদের সংকেত?
বুধবার নেপালের রসুয়া অঞ্চলে যে তাণ্ডব চলেছে, সেখানে গত বছর জুলাই মাসেও ‘লেক-ফাটা’ (Glacial Lake Outburst Flood) বিপর্যয় ঘটেছিল। বিজ্ঞানিরা এখন খতিয়ে দেখছেন, কেবল নেপাল হিমবাহ ধস নাকি এর সাথে কোনো বরফ-হ্রদ ফেটে যাওয়ার ঘটনাও জড়িত রয়েছে। ড্যানিয়েল শুগারের মতে, “জলবোমার যা রূপ আমরা দেখেছি, এর পেছনে অন্য কোনো বিষাক্ত কারণ থাকলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।”
জলবায়ু পরিবর্তনের এই যুগে হিমালয় অঞ্চলে অপরিকল্পিত উন্নয়ন থামানো না গেলে ভবিষ্যতে এমন নেপাল হিমবাহ ধস আরও বারবার ফিরে আসতে পারে বলে সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।
