Breaking
16 Sep 2026, Wed

নাইট টেরর কি: শিশু রাতে হঠাৎ চিৎকার করে কেঁদে উঠলে কি করবেন?

নাইট টেরর কি

নাইট টেরর কি এবং রাতে শিশু ভয়ে চিৎকার করে উঠলে মা-বাবার করণীয় কি? নাইট টেরর এর লক্ষণ ও প্রতিকার নিয়ে প্রাইম ইনসাইটের বিশেষ হেলথ প্রতিবেদন।

নাইট টেরর কি এবং কেন শিশুরা গভীর রাতে হঠাৎ প্রচণ্ড ভয়ে চিৎকার করে জেগে ওঠে, তা নিয়ে অনেক অভিভাবকই মারাত্মক দুশ্চিন্তায় পড়েন। রাতের নিঝুম অন্ধকারে হঠাৎ শিশুর তীব্র আত্মচিৎকার, অস্বাভাবিক শারীরিক ছটফটানি বা বিকট কান্না যেকোনো মা-বাবার হৃদকম্পন বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। এই অবস্থায় শিশু চোখ মেলিয়া তাকিয়ে থাকলেও নিজের মা-বাবাকে চিনতে পারে না, এমনকি জড়িয়ে ধরতে গেলে ধাক্কা দিয়ে ঠেলে সরিয়ে দেয়।

অধিকাংশ অভিভাবক মনে করেন শিশু হয়তো কোনো ভীষণ খারাপ স্বপ্ন দেখে ভয় পেয়েছে বা কোনো অলৌকিক আতঙ্কে রয়েছে। তবে আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে, এটি সাধারণ কোনো দুঃস্বপ্ন বা ভয় পাওয়া নয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় নাইট টেরর (Night Terrors) বা ‘স্লিপ টেরর’।

নাইট টেরর কি এবং মস্তিস্কে তখন ঠিক কি ঘটে?

নাইট টেরর কি তা সঠিকভাবে বুঝতে হলে আমাদের মানবদেহের ঘুমের পর্যায়ক্রমিক সাইকেল বা ‘স্লিপ আর্কিটেকচার’ সম্পর্কে জানা প্রয়োজন। একজন মানুষের ঘুম মূলত দুটি প্রধান ভাগে বিভক্ত—REM (Rapid Eye Movement) এবং Non-REM।

ঘুমের সবচেয়ে গভীর পর্যায়, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে N3 (Non-REM Phase) বলা হয়, ঠিক এই সময়েই নাইট টেররের পর্বটি ঘটে থাকে।

মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ স্নায়বিক বিভ্রান্তি

এই অবস্থায় শিশুর মস্তিষ্ক পূর্ণ ঘুম এবং জাগরণের মাঝখানে একধরনের বিভ্রম বা ‘মিসফায়ারিং’ অবস্থায় আটকে পড়ে:

  • সক্রিয় অংশ: মস্তিষ্কের যে অংশটি শরীরের নড়াচড়া, চিৎকার এবং স্বয়ংক্রিয় মোটর প্রতিক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ করে, তা হঠাৎ সক্রিয় হয়ে যায়।

  • অসক্রিয় অংশ: মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল কর্টেক্স—যে অংশটি মানসিকভাবে মানুষকে চিনতে সাহায্য করে এবং যুক্তি দিয়ে চিন্তা করে, তা পুরোপুরি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে।

সহজ কথায়, আপনার শিশুর শরীর জেগে উঠলেও তার মস্তিষ্ক তখনও গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকে।

নাইট টেরর এর মূল লক্ষণসমূহ

নাইট টেরর কি তা সহজে শনাক্ত করার জন্য কয়েকটি বিশেষ শারীরিক ও মানসিক লক্ষণ খেয়াল রাখা প্রয়োজন। রাতের এই পর্ব চলাকালীন আপনার শিশু নিচের আচরণগুলো করতে পারে:

  • বিছানায় হঠাৎ সটান বসে পড়া এবং বিকট স্বরে চিৎকার করে ওঠা।

  • দুই চোখ বড় বড় করে খোলা রাখা সত্ত্বেও সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মা-বাবাকে চিনতে না পারা।

  • অনবরত ও সামলানো অসম্ভব এমনভাবে কান্নাকাটি বা হাত-পা ছোঁড়া।

  • শরীর অতিরিক্ত ঘেমে যাওয়া, ত্বক লালচে হওয়া এবং হৃদস্পন্দন ও শ্বাসপ্রশ্বাসের গতি দ্রুত বেড়ে যাওয়া।

  • শান্ত করার বা কোলে নেওয়ার চেষ্টা করলে মা-বাবাকে ধাক্কা দিয়ে দূরে ঠেলে দেওয়া।

  • সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর রাতের এই আকস্মিক ঘটনা সম্পর্কে শিশুর বিন্দুমাত্র কোনো স্মৃতি না থাকা।

সাধারণত ২ থেকে ৬ বছর বয়সের শিশুদের মধ্যে নাইট টেরর সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। কারণ এই বয়সে তাদের মস্তিষ্কের মধ্যবর্তী স্নায়ুতন্ত্র বা ‘স্লিপ-ওয়েক সাইকেল’ পুরোপুরি পরিপক্ব হয়ে ওঠে না।

নাইট টেরর বনাম দুঃস্বপ্ন: মূল পার্থক্য কোথায়?

নাইট টেরর কি এবং দুঃস্বপ্ন (Nightmare) কি—এই দুটির পার্থক্য বুঝতে নিচে একটি তুলনামূলক নির্দেশিকা দেওয়া হলো:

বৈশিষ্ট দুঃস্বপ্ন (Nightmare) নাইট টেরর (Night Terror)
ঘটনার সময় রাতের শেষ ভাগে (REM Sleep) ঘটে। রাতের প্রথম ২–৩ ঘণ্টার মধ্যে (N3 Phase) ঘটে।
সচেতনতা শিশু সম্পূর্ণ জেগে যায় এবং মা-বাবাকে চেনে। শিশু আংশিক ঘুমে থাকে, কাউকে চিনতে পারে না।
স্মৃতির স্থায়িত্ব সকালে খারাপ স্বপ্নের কথা মনে রাখতে পারে। সকালে রাতের ঘটনার কোনো স্মৃতি থাকে না।
সান্ত্বনা দেওয়া আদর করলে বা কথা বললে দ্রুত শান্ত হয়। শান্ত করা কঠিন, মা-বাবাকে ধাক্কা দেয়।

নাইট টেরর হলে মা-বাবার করণীয়: কি করবেন আর কি করবেন না

নাইট টেরর কি তা জানার পাশাপাশি এই পরিস্থিতি কীভাবে ঠান্ডা মাথায় মোকাবিলা করবেন, তা জানা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

🚫 যেসব ভুল কখনোই করবেন না

  • জোড়পূর্বক ঘুম ভাঙাবেন না: এই অবস্থায় জোর করে শিশুকে ডাকার বা জাগানোর চেষ্টা করলে তার মস্তিষ্ক আরও বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে এবং পর্বটি দীর্ঘায়িত হয়।

  • জোরে ঝাঁকুনি দেবেন না: শিশুকে ধরে জোরে ঝাঁকানো বা নাম ধরে চিৎকার করা বন্ধ রাখুন।

  • হঠাৎ উজ্জ্বল আলো জ্বালাবেন না: ঘরের লাইট হঠাৎ উজ্জ্বল করে দিলে শিশু পরিবেশ দেখে তীব্র আতঙ্কিত হতে পারে।

  • প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করবেন না: “কি হয়েছে?” বা “কাকে দেখেছিস?”—এমন প্রশ্ন করবেন না, কারণ শিশু উত্তর দেওয়ার মতো সচেতন অবস্থায় থাকে না।

👍 যেসব কাজ অবশ্যই করবেন

  • ঘরের পরিবেশ শান্ত রাখুন: ঘরের আলো মৃদু রাখুন এবং অতিরিক্ত শব্দ বন্ধ করুন।

  • শারীরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করুন: শিশু যেন খাট থেকে নিচে পড়ে না যায় বা ঘরের কোনো আসবাবপত্রে আঘাত না পায় সেদিকে নজর রাখুন।

  • ধীর ও কোমল কণ্ঠে কথা বলুন: মৃদু স্বরে “তুমি নিরাপদ আছ”, “আমি তোমার পাশেই আছি”—এ ধরনের আশ্বস্তকারী কথা বলতে থাকুন।

  • ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করুন: নাইট টেররের পর্ব সাধারণত ৫ থেকে ১৫ মিনিট স্থায়ী হয়। পর্বটি শেষ হলে শিশু নিজে থেকেই স্বাভাবিক ঘুমে ফিরে যাবে।

কখন শিশু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেবেন?

নাইট টেরর একটি স্বাভাবিক বিকাশজনিত পর্যায় হলেও, নিচের পরিস্থিতিগুলোতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত:

  1. যদি ঘটনাটি সপ্তাহে ৩-৪ বারের বেশি ঘটতে থাকে।

  2. প্রতিবার ঘটনার স্থায়িত্ব ৩০ মিনিটের বেশি হলে।

  3. শিশুর মুখ দিয়ে লালা পড়া, শরীর অতিরিক্ত শক্ত হয়ে যাওয়া বা খিঁচুনির মতো লক্ষণ দেখা দিলে।

  4. নাইট টেররের কারণে দিনে শিশুর তীব্র ক্লান্তি, মেজাজ খিটখিটে হওয়া বা পড়াশোনায় ব্যাঘাত ঘটলে।

শিশুর স্বাস্থ্য ও স্নায়বিক বিকাশ সংক্রান্ত আরও বৈজ্ঞানিক তথ্যের জন্য আপনারা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার WHO official guidance এবং আমেরিকান একাডেমি অফ পেডিয়াট্রিক্স-এর HealthyChildren Pediatric Sleep Guide নির্দেশিকা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

নাইট টেরর দেখতে ভীতিকর হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে এটি ক্ষতিকর নয় এবং বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে শিশুর স্নায়ুতন্ত্র পরিপক্ব হলে এটি আপনাতেই ঠিক হয়ে যায়।

(প্রাইম ইনসাইট হেলথ ডেস্ক)

By Tanmay

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।

Leave a Reply

Enable Notifications No Allow