Breaking
16 Sep 2026, Wed

রবি নায়ার গুজরাট পুলিশ: দিল্লি ও কেরালায় প্রবীণ সাংবাদিকের বাড়িতে তল্লাশি, ডিভাইস বাজেয়াপ্ত

রবি নায়ার গুজরাট পুলিশ: দিল্লি ও কেরালায় প্রবীণ সাংবাদিকের বাড়িতে তল্লাশি, ডিভাইস বাজেয়াপ্ত

রবি নায়ার গুজরাট পুলিশ তল্লাশি অভিযান চালিয়ে প্রবীণ সাংবাদিক রবি নায়ারের দিল্লি ও কেরালার বাসভবন থেকে একাধিক ডিজিটাল ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করেছে। ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্টের জেরে এই পদক্ষেপ।

রবি নায়ার গুজরাট পুলিশ অভিযানের মাধ্যমে প্রবীণ ও স্বাধীন সাংবাদিক রবি নায়ারের বিরুদ্ধে এক কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ওয়াশিংটন পোস্ট-এর (The Washington Post) একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করার অভিযোগে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ১৭ আগস্ট, ২০২৬ তারিখে আহমেদাবাদ আদালতের জারি করা পরোয়ানা নিয়ে একযোগে রবি নায়ারের দিল্লির বাসভবন এবং কেরালার বাড়িতে তল্লাশি চালায় গুজরাট পুলিশের একটি বিশেষ দল।

এই তল্লাশি চলাকালীন কেরালার বাসভবন থেকে রবি নায়ার গুজরাট পুলিশ দলের হাতে নিজের দুটি মোবাইল ফোন তুলে দিতে বাধ্য হন। অন্যদিকে, রবি নায়ারের দিল্লির বাসভবনে তল্লাশি চালিয়ে পুলিশ তাঁর ছেলের একটি ল্যাপটপ এবং সেখানে উপস্থিত তাঁর সহকর্মী সাচী হেগড়ের একটি ল্যাপটপ ও আইপ্যাড বাজেয়াপ্ত করে। ঘটনাচক্রে, সাচী হেগড়ে বা রবি নায়ারের ছেলে—কেউই এই মামলার অভিযুক্ত তালিকায় নামভুক্ত নন। তদুপরি, ডিজিটাল প্রমাণের সত্যতা সুনিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় ‘হ্যাশ ভ্যালু’ (Hash Value) না দিয়েই পুলিশ ডিভাইসগুলি বাজেয়াপ্ত করেছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

ঘটনার মূল উৎস ও এফআইআর (FIR)-এর পটভূমি

এই আইনি জটিলতার মূল উৎস হলো আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন লিমিটেডের (APSEZ) এক কর্মকর্তার দায়ের করা অভিযোগ ২০২৫ সালের অক্টোবরে ওয়াশিংটন পোস্টে প্রকাশিত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয় যে, কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে রাষ্ট্রীয় বিমা সংস্থা এলআইসি (LIC) প্রায় ৩.৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আদানি গ্রুপের বিভিন্ন সংস্থায় বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছিল। রবি নায়ার ছিলেন এই প্রতিবেদনের সহ-লেখক।

প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর রবি নায়ার এক্স (টুইটার) সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তা নিয়ে পোস্ট করেন। আদানি গোষ্ঠীর অভিযোগ, রবি নায়ার গুজরাট পুলিশ মামলার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই পোস্টগুলির মাধ্যমে ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সংস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছেন। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়িয়ে আর্থিক ক্ষতিসাধন করা হয়েছে। এই প্রেক্ষিতে নতুন ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS)-র জালিয়াতি (Forgery) এবং প্রতারণা সংক্রান্ত ধারা অনুযায়ী মামলাটি দায়ের করা হয়।

হাইকোর্টের নির্দেশ ও ডিজিটাল প্রমাণের আইনি জটিলতা

অভিযান চালানের ঠিক কয়েকদিন আগে, ১১ আগস্ট ২০২৬-এ গুজরাট হাইকোর্ট রবি নায়ারের বিরুদ্ধে হওয়া এই এফআইআর খারিজ করার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায় যে, প্রমাণের সত্যতা ও জমা দেওয়া নথি আসল কি না, তা তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। আদালতের এই সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই রবি নায়ার গুজরাট পুলিশ তল্লাশি জোরদার করে।

তবে তদন্তের প্রক্রিয়ায় অভিযুক্ত তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তিদের ইলেকট্রনিক ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করা এবং প্রসেস না মেনে ‘হ্যাশ ভ্যালু’ না দেওয়া নিয়ে দেশের আইন ও সংবাদমাধ্যমে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। হ্যাশ ভ্যালু হলো ডিজিটাল ফাইলের এক অনন্য ইউনিক কোড, যা ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করার সময় প্রদান না করলে পরবর্তীতে তাতে কোনো ডেটা ট্যাম্পারিং বা পরিবর্তন করা হয়েছে কি না তা প্রমাণ করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। দেশের শীর্ষ আদালত ইতিপূর্বে ডিজিটাল ডিভাইস বাজেয়াপ্ত করার বিষয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশিকা মেনে চলার কথা বললেও, ক্ষেত্রে তা লঙ্ঘিত হয়েছে বলে অভিযোগ তোলা হচ্ছে।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও প্রেস ক্লাবের উদ্বেগ

এই ঘটনার পর এডিটরস গিল্ড অব ইন্ডিয়া, প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়া এবং ডিজিফাব (DIGIPUB)-এর মতো একাধিক সাংবাদিক সংগঠন ও মানবাধিকার কর্মী তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন। রবি নায়ার গুজরাট পুলিশ অভিযানের ধরণ দেখে বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে কর্মরত প্রেস ফ্রিডম সংস্থাগুলিও গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

সাংবাদিক সংগঠনগুলির দাবি, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মূল উৎস (Source) চিহ্নিত করতেই এবং স্বাধীন সাংবাদিকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে আইনি ব্যবস্থার এমন অপব্যবহার করা হচ্ছে। অভিযুক্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য নিরীহ সহকর্মী ও পরিবারের সদস্যদের ব্যক্তিগত ডিভাইস নিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতার ওপর সরাসরি আঘাত বলে গণ্য করা হচ্ছে। সব মিলিয়ে রবি নায়ার গুজরাট পুলিশ বিতর্কটি ভারতের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের ডিজিটাল অধিকারের সুরক্ষাকে পুনরায় বড় প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।

By Tanmay

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।

Leave a Reply

Enable Notifications No Allow