Breaking
16 Sep 2026, Wed

সৎ বাবার নাম জন্ম শংসাপত্রে: ঐতিহাসিক রায়ে পিতৃত্বের নতুন আইনি স্বীকৃতি দিল কলকাতা হাই কোর্ট

8e91a33b 5d3a 4117 a835

সৎ বাবার নাম জন্ম শংসাপত্রে যুক্ত করার অনুমতি দিয়ে কলকাতা হাই কোর্টের ঐতিহাসিক রায়। জানুন জন্ম শংসাপত্রে পিতৃপরিচয় পরিবর্তনের এই যুগান্তকারী আইনি নির্দেশের বিস্তারিত তথ্য।

কলকাতা : সৎ বাবার নাম জন্ম শংসাপত্রে অন্তর্ভুক্ত করার সংক্রান্ত এক ঐতিহাসিক মামলার রায়ে বড় সিদ্ধান্ত শোনাল কলকাতা হাই কোর্ট। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, সমাজ এখন অনেক এগিয়েছে। পরিবর্তিত সামাজিক ও পারিবারিক প্রেক্ষাপটে সন্তানের জন্ম শংসাপত্রে শুধুমাত্র জৈবিক বাবার নামই বহন করে যেতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। মায়ের দ্বিতীয় বিবাহের পর নতুন অভিভাবকত্বের আইনি স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে এবার থেকে জন্ম শংসাপত্রে সংশোধন আনা সম্ভব।

পূর্ব বর্ধমান পুরসভা এলাকার একটি রিট পিটিশনের (WPA 21054 of 2025) প্রেক্ষিতে শুনানি চলাকালীন বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরী এই যুগান্তকারী নির্দেশ প্রদান করেন। এই নির্দেশের ফলে বহু পরিবারের দীর্ঘদিনের আইনি জটিলতার স্থায়ী অবসান ঘটল।

মামলার প্রেক্ষাপট ও আইনি জটিলতার সূচনা

মামলার নথিসূত্রে জানা যায়, মামলাকারী বর্ণালী ঘোষ (কর্মকার) ২০১২ সালের এপ্রিল মাসে শুভঙ্কর কর্মকার নামে এক ব্যক্তির সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন এবং তাঁদের একটি পুত্রসন্তান জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীতে পারিবারিক কলহের জেরে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে পারস্পরিক সম্মতিতে তাঁদের আইনি বিচ্ছেদ ঘটে। এরপর ২০২২ সালের মার্চ মাসে বর্ণালীদেবী রাজেশ ঘোষের সঙ্গে পুনরায় নতুন জীবন শুরু করেন।

কিন্তু সন্তানের স্কুলে ভর্তি ও অন্যান্য প্রশাসনিক নথিপত্রে শুরু হয় মারাত্মক জটিলতা। সন্তানকে নিজের সন্তানের মতো ভালোবেসে লালন-পালন করতে সৎ বাবার কোনো আপত্তি না থাকলেও, বাধা হয়ে দাঁড়ায় জন্ম শংসাপত্রের তথ্য ও পুরসভার আইনি নিয়মাবলি।

পূর্ব বর্ধমান পুরসভা কর্তৃপক্ষের দাবি ছিল, ১৯৬৫ সালের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন এবং পুরসভার নির্দিষ্ট নিয়মানুযায়ী একবার জন্ম রেজিস্টারে জৈবিক বাবার নাম নথিভুক্ত হয়ে গেলে তা পরিবর্তন বা সংশোধন করার সরাসরি সুযোগ থাকে না। প্রশাসনিক এই অনমনীয়তার বিরুদ্ধেই ন্যায়বিচারের আশায় কলকাতা হাই কোর্টের দ্বারস্থ হন শিশুর মা।

আদালতে শুনানির ধারা ও সুপ্রিম কোর্টের নজির

বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরীর এজলাসে মামলাটি উঠলে শিশুর মানসিক দিকটি বিশেষ গুরুত্ব পায়। আইনজীবী মারফত আদালতে জানানো হয় যে, জৈবিক পিতা বিচ্ছেদের পর সন্তানের দায়-দায়িত্ব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। শিশুর বর্তমান মানসিক বিকাশ ও ভবিষ্যতের সুরক্ষার কথা চিন্তা করে নথিতে সৎ বাবার নাম জন্ম শংসাপত্রে যুক্ত করা অত্যন্ত জরুরি ছিল।

হাই কোর্টে শুনানির সময় নিম্নলিখিত উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলি পরিলক্ষিত হয়:

  • জৈবিক পিতার সম্মতি: পেপার পাবলিকেশনের মাধ্যমে আইনি নোটিশ পাঠানোর পর আদালতে হাজির হয়ে জন্মদাতা বাবা জানান যে, শংসাপত্রে নাম সংশোধনে তাঁর কোনো আপত্তি নেই।

  • চেম্বার কথোপকথন: বিচারক নিজে চেম্বারে শিশুটি এবং তার অভিভাবকদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন।

  • সুপ্রিম কোর্টের রায়ের উল্লেখ: এই মামলার রায়ে সুপ্রিম কোর্টের বিখ্যাত আকেলা ললিতা বনাম কোন্ডা হনুমন্ত রাও (২০২২) মামলার নজির টানা হয়, যেখানে একক মা হিসেবে সন্তানের পদবি নির্ধারণের ক্ষমতার স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।

  • ১৯৬৯ সালের জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন আইন: এই আইনের ১৫ ধারা প্রয়োগ করে বলা হয়, রেকর্ডের ভুল বা অপ্রাসঙ্গিক তথ্য সংশোধন বা সংযোজন করার পূর্ণ অধিকার কর্তৃপক্ষের রয়েছে।

হাই কোর্টের ঐতিহাসিক পর্যবেক্ষণ ও নির্দেশনা

বিচারপতি রাজা বসু চৌধুরী তাঁর পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট উল্লেখ করেন:

“সমাজ অনেক দূর এগিয়ে গেছে। আজকের আধুনিক বিশ্বে জন্ম রেজিস্টারে বাধ্যতামূলকভাবে কেবল জৈবিক বাবার নাম ধরে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। কোনো ব্যক্তিগত বা পারিবারিক জটিলতায় প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের ‘হাইপার-টেকনিক্যাল’ বা অতিরিক্ত কঠোর মনোভাব দেখানো উচিত নয়।”

হাই কোর্টের নির্দেশিকার প্রধান শর্তাবলী:
├── পূর্বের বার্থ সার্টিফিকেট বাতিল না করে একটি 'Addendum' (সংযোজনী) ইস্যু করা।
├── নতুন সংযোজনীতে সৎ বাবার নাম এবং শিশুর পরিবর্তিত পদবি যুক্ত করা।
├── পুরানো সার্টিফিকেটের ক্রমিক নম্বর ও ইস্যুর তারিখ নতুন নথিতে উল্লেখ রাখা।
└── শিশু প্রাপ্তবয়স্ক হলে নিজের ইচ্ছা অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার অধিকার পাবে।

সাধারণ মানুষের জন্য কী বার্তা দিচ্ছে এই রায়?

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কলকাতা হাই কোর্টের এই নির্দেশ ভারতের পারিবারিক আইনের ক্ষেত্রে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। একক মা কিংবা দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়া নারীদের সন্তানদের প্রশাসনিক ও সামাজিক সুবিধা পাওয়ার পথ এতে অনেক সহজ হলো। শিশু অধিকার রক্ষায় এই ধরনের রায় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

পারিবারিক আইন সংক্রান্ত আরও তথ্যের জন্য ভারত সরকারের Ministry of Law and Justice-এর অফিশিয়াল পোর্টাল অথবা আইনসংক্রান্ত জাতীয় ডেটাবেস LiveLaw India-তে চোখ রাখতে পারেন।

By Tanmay

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।

Leave a Reply

Enable Notifications No Allow