রঘুনাথগঞ্জে শিশুকন্যা উদ্ধারকে কেন্দ্র করে তীব্র চাঞ্চল্য। ১১ দিনের শিশুকে বাথরুমের বালতির জলে চুবিয়ে খুনের অভিযোগ মুর্শিদাবাদে।
নিজস্ব সংবাদদাতা, রঘুনাথগঞ্জ, মুর্শিদাবাদ: রঘুনাথগঞ্জে শিশুকন্যা উদ্ধারকে কেন্দ্র করে রবিবার সকালে তীব্র চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হলো মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ থানা এলাকায়। মাত্র ১১ দিন আগে জন্ম নেওয়া এক সদ্যজাত শিশুকন্যাকে বিছানা থেকে তুলে নিয়ে বাথরুমের বালতির জলে চুবিয়ে হত্যার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। পাশাপাশি ঘুমিয়ে থাকা দুটি শিশুর মধ্যে একটি আচমকা উধাও হয়ে যাওয়া এবং প্রায় তিন ঘণ্টা পর বাড়ির বাথরুমের প্লাস্টিকের বালতি থেকে তার নীল হয়ে যাওয়া অসাড় দেহ উদ্ধারের ঘটনায় স্তম্ভিত পুরো এলাকা।
ঘটনার সূত্রপাত রবিবার খুব ভোরে। রঘুনাথগঞ্জের ওই বাড়িতে সদ্য মা হওয়া সাগরি খাতুন নিজের সন্তানকে বিছানায় ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিলেন। পাশে সাগরি খাতুনের দাদার ছোট ছেলেও ঘুমোচ্ছিল। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, সাগরি খাতুন তাঁর ১১ দিনের শিশুকন্যা ও দাদাতো ভাইকে এক বিছানায় পাশাপাশি শুইয়ে রেখে কিছুক্ষণের জন্য বাড়ির ছাদে গিয়েছিলেন। সেই সময় ঘরের ভেতরে পরিবারের অন্য কোনো সদস্য ছিলেন না। তবে অল্প কিছুক্ষণ পর ছাদ থেকে নিচে নেমে নিজের ঘরে ফিরতেই চোখ কপালে ওঠে মায়ের।
তিনি দেখেন, ঘরের বিছানার তোশক ও জিনিসপত্র কিছুটা ওলটপালট হয়ে রয়েছে এবং সেখানে তাঁর ১১ দিনের কন্যাসন্তানটি নেই। সাগরি খাতুনের আর্তচিৎকারে পরিবারের অন্য সদস্য ও প্রতিবেশীরা দ্রুত সেখানে ছুটে আসেন। সঙ্গে সঙ্গে তন্য তন্য করে সারা বাড়ি ও আশেপাশের এলাকা জুড়ে সন্ধান শুরু হয়। ঘরের আলমারির পেছন, খাটের তলা থেকে শুরু করে উঠোন—সব জায়গায় খোঁজাখুঁজি চললেও শিশুটির কোনো হদিস মেলেনি।
ঘটনার প্রায় তিন ঘণ্টা পর, সকালের দিকে বাড়িরই একটি বাথরুমের ভেতরে থাকা ঢাকা দেওয়া বড় বালতির ঢাকনা খুলতেই মেলে সেই নৃশংস দৃশ্য। দেখা যায়, বালতির কানায় কানায় ভরা জলের ভেতর উলটো হয়ে ভেসে রয়েছে ১১ দিনের শিশুকন্যাটি। তড়িঘড়ি তাকে উদ্ধার করা হলেও ততক্ষণে শিশুটির পুরো শরীর জমে গিয়ে নীল হয়ে গিয়েছে। ১১ দিনের সন্তানের এমন ভয়ঙ্কর ও মর্মান্তিক পরিণতি দেখে শোকে পাথর হয়ে পড়েছেন মা সাগরি খাতুন। কান্না আর চোখের জল ছাড়া তাঁর কাছে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।
উল্লেখ্য, এই হাড়হিম করা ঘটনাটি ঘটেছে সাগরি খাতুনের বাপের বাড়িতেই। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, নিজের মা, দাদা ও বৌদির সঙ্গে এই রঘুনাথগঞ্জের বাড়িতেই স্থায়ীভাবে থাকেন সাগরি ও তাঁর স্বামী। সাগরি খাতুন জানান, তাঁর স্বামী ভোরবেলাই নিজের কাজের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়েছিলেন। স্বামী বেরিয়ে যাওয়ার পরেই তিনি মেয়েকে ঘুম পাড়িয়ে ছাদে যান। কিন্তু মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে কীভাবে একটি ১১ দিনের শিশু উধাও হয়ে বাথরুমের বন্ধ বালতিতে পৌঁছাল, তা ভেবে কূল পাচ্ছেন না কেউই।
এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুলিশের তদন্তে একাধিক গুরুতর প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে:
-
প্রথমত, মাত্র ১১ দিনের একটি নিষ্পাপ শিশুকে বাথরুমের বালতির জলে চুবিয়ে খুন করল কারা?
-
দ্বিতীয়ত, এই নৃশংস ঘটনার নেপথ্যে কি পরিবারেরই কোনো পরিচিত মানুষের হাত রয়েছে, নাকি এটি কোনো পরিকল্পিত অপরাধ?
এলাকার স্থানীয় প্রতিবেশীদের একটি বড় অংশের দাবি, বহিরাগত কারও পক্ষে এত কম সময়ের মধ্যে ঘরের ভেতরে ঢুকে শুধু শিশুটিকে তুলে নিয়ে বাথরুমে গিয়ে বালতিতে ডুবিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। পরিবারের ভেতরের কোনো সদস্যই এই কাণ্ড ঘটিয়ে থাকতে পারে বলে তাঁদের প্রাথমিক অনুমান। অন্যদিকে, পরিবারের তরফে প্রাথমিক সন্দেহের আঙুল তোলা হয়েছিল ছদ্মবেশী কোনো ভিখারি বা বহিরাগত দুষ্কৃতীর দিকে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, সকালে গোটা পাড়ায় কোনো ভিখারি বা সন্দেহভাজন বহিরাগত ব্যক্তিকে ঘোরাফেরা করতে দেখা যায়নি।
ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই রঘুনাথগঞ্জ থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। তদন্তের তীব্রতা বাড়াতে সরেজমিনে উপস্থিত হন জঙ্গিপুরের এসডিপিও প্রবীর মণ্ডল এবং রঘুনাথগঞ্জ থানার আইসি সৌরভ চট্টোপাধ্যায়। পুলিশ কর্মকর্তা ও তদন্তকারী দল ঘটনাস্থল থেকে গুরুত্বপূর্ণ আলামত সংগ্রহ করেছেন এবং পরিবারের প্রতিটি সদস্যকে আলাদা আলাদাভাবে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেছেন।
পুলিশের প্রাথমিক অনুমান, পারিবারিক কোনো কোন্দল, কন্যাসন্তান জন্ম নেওয়া নিয়ে অসন্তোষ নাকি অন্য কোনো পুরনো শত্রুতার জেরে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটিয়ে শিশুকন্যাটিকে হত্যা করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রঘুনাথগঞ্জে শিশুকন্যা উদ্ধারের পর দেহটি ময়নাতদন্তের জন্য স্থানীয় জেলা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট এলেই মৃত্যুর সঠিক সময় ও কারণ স্পষ্ট হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ প্রশাসন। তবে এই ঘটনার সঠিক বিচার ও অপরাধীদের দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দারা।

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।
