শিশুদের জন্য Bad Health Effect Of Gems সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক তথ্য জানুন। ক্যাডবেরি জেমসে ব্যবহৃত কৃত্রিম রং, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিয়ে প্রাইম ইনসাইটের বিশেষ অনুসন্ধান।
হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন ডেস্ক, প্রাইম ইনসাইট – উজ্জ্বল এবং নানারকম চকচকে রঙে সাজানো ক্যাডবেরি জেমস (Cadbury Gems) দশকের পর দশক ধরে শিশু ও কিশোরদের অত্যন্ত প্রিয় একটি ক্যান্ডি। তবে চকলেটের ভেতরের অংশ যতটা আকর্ষণীয়, তার বাইরের রঙিন কোটিংয়ে ব্যবহৃত কৃত্রিম কেমিক্যাল ও ফুড ডাই (Food Dyes) নিয়ে খাদ্য নিরাপত্তা গবেষক এবং শিশু চিকিৎসকদের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, এসব রঙে ব্যবহৃত কিছু নির্দিষ্ট সিন্থেটিক উপাদান শিশুদের শরীরের জন্য নানা স্বাস্থ্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। সম্প্রতি bad health effect of gems এবং এর কেমিক্যাল উপাদান নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে প্রাইম ইনসাইটের এই বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।
ক্যাডবেরি জেমসের রঙিন কোটিং এবং এতে ব্যবহৃত কেমিক্যালের ধরন
ক্যাডবেরি জেমসের আকর্ষণীয় রঙের মূলে রয়েছে বেশ কিছু কৃত্রিম ফুড কালার বা কোল-টার (Coal-tar) ভিত্তিক সিন্থেটিক ডাই। এগুলো প্রাকৃতিকভাবে তৈরি নয়, বরং রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় তৈরি করা হয়। জেমসের প্রতিটি নির্দিষ্ট রঙের জন্য আলাদা আলাদা রাসায়নিক রঞ্জক ব্যবহৃত হয়, যা শিশুদের সংবেদনশীল শরীরে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে:
১. লাল রং (Red 40 / Allura Red AC & Red 3)
-
রাসায়নিক উপাদান: পেট্রোলিয়াম ভিত্তিক অ্যালুরা রেড এবং ইরিথ্রোসিন।
-
স্বাস্থ্য ঝুঁকি: একাধিক আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য গবেষণায় দেখা গেছে, অ্যালুরা রেড শিশুদের মধ্যে অতিরিক্ত চঞ্চলতা (Hyperactivity) এবং এডিএইচডি (ADHD)-এর লক্ষণ বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে, লাল-৩ রঞ্জকটি থাইরয়েড গ্রন্থির কাজ ব্যাহত করা এবং জিনগত কোষ পরিবর্তনের ঝুঁকি বাড়ায় বলে গবেষকদের মত।
২. হলুদ রং (Yellow 5 / Tartrazine & Yellow 6 / Sunset Yellow)
-
রাসায়নিক উপাদান: অ্যাজো-ডাই (Azo dyes) গোত্রীয় টারট্রাজিন এবং সানসেট ইয়েলো।
-
স্বাস্থ্য ঝুঁকি: টারট্রাজিন শিশুদের শ্বাসকষ্ট, অ্যালার্জি এবং হাঁপানিসদৃশ সমস্যা বাড়াতে অত্যন্ত সক্রিয় ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি এটি কিডনি এবং যকৃতের (Liver) মেটাবলিক প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
৩. নীল রং (Blue 1 / Brilliant Blue FCF)
-
রাসায়নিক উপাদান: ট্রাইফেনাইলমিথেন ভিত্তিক সিন্থেটিক কালার।
-
স্বাস্থ্য ঝুঁকি: এই রংটি খুব দ্রুত রক্তে শোষিত হতে পারে। চিকিৎসকদের একাংশের মতে, এটি স্নায়ুতন্ত্রের ওপর প্রভাব ফেলে অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া এবং শিশুদের মনযোগে বিঘ্ন ঘটাতে পারে।
৪. সবুজ রং (Fast Green FCF / Green 3)
-
রাসায়নিক উপাদান: সিন্থেটিক অর্গানিক কেমিক্যাল।
-
স্বাস্থ্য ঝুঁকি: গবেষণাগারে প্রাণীদের ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, এটি মূত্রাশয় (Bladder) এবং অস্থিমজ্জার কোষ উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলে।
৫. সাদা ও চকচকে কোটিং (Titanium Dioxide / E171)
-
রাসায়নিক উপাদান: অজৈব খনিজ ন্যানোপার্টিকল।
-
স্বাস্থ্য ঝুঁকি: ক্যাডবেরি জেমসের বাইরের খোলসটিকে চকচকে ও মসৃণ করার জন্য অনেক সময় টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড ব্যবহার করা হতো। এই কেমিক্যালের ন্যানো-কণা ডিএনএ ক্ষতিগ্রস্থ (Genotoxicity) করার জন্য দায়ী বলে প্রমাণিত হয়েছে।
আরো পড়ুন:
Cockroach Milk Benefits: আরশোলার দুধে এত পুষ্টি? ভারতীয় বিজ্ঞানীদের
আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা: কোন দেশ, কবে এবং কেন এসব রং নিষিদ্ধ করেছে?
খাদ্যে ব্যবহৃত ক্ষতিকর কেমিক্যাল ও কৃত্রিম রঞ্জকের প্রভাব নিয়ে ১৯ শতক থেকে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান শুরু হলেও, বিশ শতকের শেষভাগ এবং একবিংশ শতাব্দীতে বিভিন্ন দেশ শিশুদের সুরক্ষায় কঠোর আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
১. ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং সাউথ্যাম্পটন স্টাডি (২০০৭-২০১০)
২০০৭ সালে যুক্তরাজ্যের সাউথ্যাম্পটন বিশ্ববিদ্যালয় (Southampton University) একটি ঐতিহাসিক গবেষণা প্রকাশ করে। তারা প্রমাণ করে যে, আর্টিফিশিয়াল ফুড কালার এবং সোডিয়াম বেনজোয়েট প্রিজারভেটিভের মিশ্রণ শিশুদের মেজাজ খিটখিটে করে এবং চঞ্চলতা বাড়িয়ে দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১০ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) আইন পাস করে যে, এসব রঙযুক্ত খাবারে necessarily “শিশুদের মনোযোগ ও চঞ্চলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে” সতর্কবার্তা ছাপাতে হবে।
২. টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইড (E171) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (২০২২)
ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (EFSA) ২০২১ সালে এক পর্যালোচনায় জানায়, টাইটানিয়াম ডাই-অক্সাইডকে আর খাদ্যের জন্য ‘নিরাপদ’ বলা যায় না। ২০২২ সালে সমগ্র ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU-এর ২৭টি দেশ) ও সুইজারল্যান্ডে এটি খাদ্য উৎপাদনে পুরোপুরি ব্যান করা হয়।
৩. নরওয়ে, জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার কড়াকড়ি (১৯৭৮ – ১৯৯০)
নরওয়ে ১৯৭৮ সালেই পেট্রোলিয়াম ভিত্তিক অনেক কৃত্রিম রং খাদ্যদ্রব্যে ব্যান করে। এছাড়া সুইডেন, জার্মানি ও ফ্রান্স বিভিন্ন সময়ে তাদের দেশীয় আইনে ব্লু-১, গ্রিন-৩ এবং টারট্রাজিনের মাত্রা সীমিত ও নিষিদ্ধ করে।
৪. যুক্তরাষ্ট্রে সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা (২০২৩-২০২৬)
যুক্তরাষ্ট্রের ফুড অ্যান্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (FDA) কিছু রং অনুমোদন করলেও, দেশটির ক্যালিফোর্নিয়া রাজ্য ২০২৩ সালে ‘California Food Safety Act’ পাস করে, যার অধীনে রেড-৩ সহ একাধিক ক্ষতিকর কেমিক্যাল খাবার তৈরিতে নিষিদ্ধ করা হয়। অন্যান্য রাজ্যগুলোও একই পথে হাঁটছে।
আরো পড়ুন:
পুজোর আগে ওজন কমানোর সহজ উপায়: কঠোর ডায়েট ছাড়া ফিট থাকার ১০ নিয়ম
বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ ও কড়াকড়ি হওয়া রঙের সময়সারণী
| রঙের নাম ও ই-কোড (E-Number) | নিষিদ্ধ বা কড়াকড়ির শিকার হওয়া প্রধান দেশসমূহ | সময়কাল | প্রধান স্বাস্থ্যগত কারণ |
| Red 40 (E129) & Red 3 (E127) | নরওয়ে, সুইজারল্যান্ড, ইউকে, ক্যালিফোর্নিয়া (ইউএস) | ১৯৭৮ – ২০২৫ | এডিএইচডি, আচরণগত পরিবর্তন, থাইরয়েড ঝুঁকি |
| Yellow 5 (E102) & Yellow 6 (E110) | নরওয়ে, জার্মানি, অষ্ট্রিয়া, সুইডেন, ইইউ | ১৯৭০ – ২০১০ (সতর্কবার্তা) | অ্যাজমা, শ্বাসনালীর অ্যালার্জি, কিডনিতে চাপ |
| Blue 1 (E133) & Green 3 (E143) | ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, জাপান | ১৯৭৮ – ১৯৯০-এর দশক | স্নায়বিক প্রতিক্রিয়া ও কোষীয় পরিবর্তন |
| Titanium Dioxide (E171) | ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি দেশ, সুইজারল্যান্ড | ২০২২ | জিনোটক্সিসিটি ও ডিএনএ ক্ষয়ের ঝুঁকি |
শিশু স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পুষ্টিবিদদের মতামত
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং শিশু চিকিৎসকদের মতে, শিশুদের পাচনতন্ত্র এবং রক্ত-মস্তিষ্কের বাধা (Blood-brain barrier) প্রাপ্তবয়স্কদের মতো পূর্ণাঙ্গ নয়। ফলে বিষাক্ত রাসায়নিকের সামান্য অংশও তাদের শরীরে বড় প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে।
“কৃত্রিম রং এবং প্রসেসড সুগার দিয়ে তৈরি ক্যান্ডি শিশুদের পুষ্টিগত কোনো উপকার তো করেই না, বরং এটি তাদের মনোযোগের ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং কৃত্রিম খাবারের প্রতি আসক্তি বাড়িয়ে তোলে।”
— ডা. এ. কে. শর্মা, শিশু বিশেষজ্ঞ
আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নির্দেশিকা ও বৈজ্ঞানিক তথ্য জানতে দেখুন World Health Organization (WHO)। এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তা সম্পর্কিত গবেষণার বিস্তারিত জানতে ভিজিট করুন European Food Safety Authority (EFSA)।
অভিভাবকদের জন্য পরামর্শ ও স্বাস্থ্যকর বিকল্প
শিশুদেরকে bad health effect of gems এবং অনুরূপ কেমিক্যালযুক্ত কৃত্রিম ক্যান্ডির ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দূরে রাখতে অভিভাবকরা নিচের পদক্ষেপগুলো নিতে পারেন:
-
প্যাকেটের উপাদান পরীক্ষা করুন: যেকোনো প্রক্রিয়াজাত খাবার কেনার আগে এর পেছনের লেবেল দেখুন। যদি E102, E110, E129, E133 বা ‘Artificial Colors’ লেখা থাকে, তবে তা এড়িয়ে চলাই ভালো।
-
প্রাকৃতিক বিকল্প দিন: রঙিন চকলেটের বদলে শিশুকে তাজা ফল (যেমন: স্ট্রবেরি, আঙুর, বেদানা) বা বাড়িতে তৈরি প্রাকৃতিক ড্রাই ফ্রুটস ও চকলেটের মিষ্টি তৈরি করে দিন।
-
সচেতনতা সৃষ্টি করুন: শিশুদের কেমিক্যালের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সহজ ভাষায় বুঝিয়ে বলুন, যাতে তারা বাইরে নিজের ইচ্ছায় এসব খাবার কেনা কমিয়ে দেয়।
শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রাকৃতিক ও সুষম খাদ্যের কোনো বিকল্প নেই। সচেতনতাই পারে আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে ক্ষতিকর খাদ্য রঞ্জকের বিষাক্ততা থেকে সুরক্ষিত রাখতে।

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।
