Breaking
16 Sep 2026, Wed

অন্নপূর্ণা যোজনা বিক্ষোভ নিয়ে মুখ খুললেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তৃণমূলের দিকে আঙুল তুলে মুখ্যমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের আশ্বাস দিলেন তিনি। পড়ুন বিস্তারিত।

মেদিনীপুর: রাজ্যে অন্নপূর্ণা যোজনা চালু হওয়ার পর থেকেই শুরু হয়েছে তুমুল বিতণ্ডা। অন্নপূর্ণা যোজনা বিক্ষোভ এখন সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক আঙিনায় অন্যতম চর্চিত বিষয়। উত্তর থেকে দক্ষিণ—রাজ্যের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে মহিলাদের সামাজিক ও আর্থিক নিরাপত্তার জন্য চালু হওয়া এই ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্পকে ঘিরে আবেদনকারীদের অসন্তোষ প্রতিদিন তীব্র হচ্ছে। ভাতার প্রাপ্য অর্থ নিয়মিত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে না পৌঁছানো, পোর্টালের প্রযুক্তিগত ত্রুটি এবং নথিপত্র যাচাইকরণের প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা ও গাফিলতির অভিযোগে শুক্রবারও একাধিক জেলায় ক্ষোভে ফেটে পড়েন বঞ্চিত মহিলারা।

রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে পথ অবরোধের পাশাপাশি রেল পরিষেবা স্তব্ধ করে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে দাঁড়িয়ে অন্নপূর্ণা যোজনা বিক্ষোভ নিয়ে সরাসরি রাজ্যের পূর্ববর্তী শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসকে কাঠগড়ায় তুললেন পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তাঁর বিস্ফোরক অভিযোগ— “তৃণমূলের লোকই ভেতরে বসে রয়েছে, ওরাই সমস্ত গন্ডগোল পাকাচ্ছে!”

মেদিনীপুরে প্রশাসনিক বৈঠকের মাঝেই অন্নপূর্ণা যোজনা বিক্ষোভ

শুক্রবার পশ্চিম মেদিনীপুর জেলাশাসকের দপ্তরে একটি পূর্বনির্ধারিত প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে যান পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। কিন্তু জেলাশাসকের ভবনে প্রবেশের মুহূর্তেই স্থানীয় বঞ্চিত আবেদনকারী মহিলাদের প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় তাঁকে। পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নেয় যখন বৈঠক চলাকালীনই আচমকা ভবনের নীচতলায় ঢুকে পড়েন শত শত মহিলা।

আবেদনকারীদের চিৎকার ও ক্ষোভের জেরে সৃষ্টি হয় চরম বিশৃঙ্খলা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুপুর আড়াইটে নাগাদ প্রশাসনিক বৈঠক মুলতুবি রাখতে বাধ্য হন মন্ত্রী। পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে অগ্নিমিত্রা পাল নিজেই নীচতলায় নেমে আসেন এবং অন্নপূর্ণা যোজনা বিক্ষোভ প্রদর্শনকারী মহিলাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তাঁদের ক্ষোভের কারণ শোনেন।

নথিপত্রের চক্কর ও সরকারি অব্যবস্থার অভিযোগ

বিক্ষোভস্থলে দাঁড়িয়ে মন্ত্রী মহিলাদের কাছে জানতে চান, যাচাইকরণের প্রক্রিয়ায় নাম বাদ পড়েছে নাকি বিগত মাসগুলোতে তাঁরা কোনো আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। উপস্থিত মহিলারা সমস্বরে জানান, আবেদন মঞ্জুর হওয়া সত্ত্বেও তাঁরা একটি মাসেরও ভাতার টাকা পাননি।

শুধু টাকা না-পাওয়াই নয়, প্রশাসনিক হয়রানির চিত্রও তুলে ধরেন বঞ্চিত মহিলারা। তাঁদের অভিযোগ, সামান্য কাগজের কাজের জন্য দিনের পর দিন এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে চক্কর কাটতে হচ্ছে। এসডিও (SDO) অফিসে গেলে তাঁদের পুরসভায় পাঠানো হচ্ছে, আর পুরসভায় যোগাযোগ করলে ফেরত পাঠানো হচ্ছে এসডিও অফিসে। এই টানা-হ্যাঁচড়ার দরুন সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে।

‘তৃণমূলের লোকই ভেতরে আছে’: সরব পুরমন্ত্রী

ভোক্তাভুগীদের এই দুরবস্থার কথা শোনার পর কড়া অবস্থান নেন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। উপস্থিত সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দাবি করেন, প্রশাসনিক ব্যবস্থার ভেতরে থাকা প্রাক্তন শাসকদলের অনুগামীরাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং নতুন সরকারের কাজকে ব্যাহত করার চেষ্টা করছে।

মন্ত্রীর কথায়, “অনেক তৃণমূলের লোক ভিতরে বসে রয়েছে। তারাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে গন্ডগোল পাকাচ্ছে এবং প্রক্রিয়াটি ধীরগতির করে দিচ্ছে। তবে আমরা এই ধরনের সাবোটাজ বরদাস্ত করব না। আমি ব্যক্তিগতভাবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নজরে সমগ্র বিষয়টি আনব এবং প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানাব।”

একই সঙ্গে আন্দোলনকারী মহিলাদের শান্ত থাকার ও ধৈর্য ধরার আহ্বান জানান মন্ত্রী। তিনি মনে করিয়ে দেন, “একটু সময় দিতে হবে। সবে তো নতুন সরকার ১০০ দিন পূর্ণ করেছে। সমস্ত বকেয়া কাজ দ্রুত গুটিয়ে আনা হচ্ছে।”

জরুরি ভিত্তিতে নোডাল অফিসার নিয়োগের নির্দেশ

বিক্ষোভ সামাল দিতে এবং প্রশাসনিক লালফিতের ফাঁশ কাটতে ঘটনাস্থলেই তৎপর হন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে জেলাশাসককে নির্দেশ দেন প্রতিটি মহকুমায় এক জন করে ‘নোডাল অফিসার’ নিয়োগ করার জন্য।

এই নোডাল অফিসাররা সরাসরি মহিলাদের আবেদনপত্র, পোর্টাল এন্ট্রি এবং ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সমস্যা সমাধান করবেন, যাতে সাধারণ মানুষকে এসডিও বা পুরসভায় বারবার দৌড়ঝাঁপ না করতে হয়। মন্ত্রীর এই সুনির্দিষ্ট আশ্বাসের পর ধীরে ধীরে শান্ত হয় অন্নপূর্ণা যোজনা বিক্ষোভ কেন্দ্রিক উত্তেজনা।

কেন ছড়াচ্ছে অন্নপূর্ণা যোজনা বিক্ষোভ?

রাজ্যের কোটি কোটি মহিলার জন্য মাসে ৩,০০০ টাকা সহায়তার লক্ষ্যে চালু হওয়া এই সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্প নিয়ে প্রশাসনের অন্দরেও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। আবেদনের বিশাল চাপ, পুরনো ডাটাবেস থেকে নতুন পোর্টালে তথ্য স্থানান্তর এবং নথি যাচাইকরণের প্রশাসনিক ধীরগতিই মূলত এই অসন্তোষের প্রধান কারণ। রাজ্য সরকার দ্রুত বিশেষ নোডাল অফিসারদের মাধ্যমে পোর্টালের সমস্যা মেটানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও, মাঠপর্যায়ে এই বিক্ষোভ কত দ্রুত প্রশমিত হয়, সেটাই এখন দেখার।

By Tanmay

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।

Leave a Reply

Enable Notifications No Allow