অন্নপূর্ণা যোজনা দিলীপ ঘোষ-এর বিতর্কিত মন্তব্য নিয়ে তোলপাড় রাজ্য। ৩ হাজার টাকা না পাওয়ায় ক্ষোভ-বিক্ষোভের মুখে তৃণমূলের দেওয়া অভ্যাসের ওপর দায় চাপালেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী।
অন্নপূর্ণা যোজনা দিলীপ ঘোষ প্রসঙ্গ এখন রাজ্য রাজনীতির অন্যতম চর্চিত বিষয়। অন্নপূর্ণা যোজনার প্রতি মাসে নির্ধারিত তিন হাজার টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে না পাওয়ার অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন প্রান্তে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ ও বিক্ষোভ দানা বাঁধতে শুরু করেছে। ঠিক এই রকম এক উত্তপ্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে তৃণমূল কংগ্রেসের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পকে নিশানা করে এক বিস্ফোরক মন্তব্য করলেন পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য, তৃণমূলের আমলে যেভাবে অবাধে ও নির্বিচারে আর্থিক ভাতা বণ্টন করা হয়েছে, তার ফলেই সাধারণ মানুষের অভ্যাস নষ্ট হয়ে গিয়েছে।
অন্নপূর্ণা যোজনা ও যোগ্যতার মানদণ্ড
অন্নপূর্ণা যোজনা দিলীপ ঘোষ যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, তা থেকে স্পষ্ট যে সরকারি সাহায্যের একটি নির্দিষ্ট আইনি ও প্রশাসনিক সীমা রয়েছে। দিলীপ ঘোষের মতে, “তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় যে ভাবে মুড়ি-মুড়কির মতো লক্ষ্মীর ভাণ্ডার দেওয়া হয়েছে, তাতে মানুষের অভ্যাস খারাপ হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সবাইকে এটা বুঝতে হবে যে, প্রকল্পের জন্য যাঁরা প্রকৃত অর্থে উপযুক্ত এবং নির্দিষ্ট ক্রাইটেরিয়ার মধ্যে পড়বেন, শুধু তাঁরাই এই সরকারি টাকা পাবেন। বাকিরা পাবেন না।”
শনিবার সকালে নিয়মমাফিক প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন পঞ্চায়েতমন্ত্রী। অন্নপূর্ণা যোজনা দিলীপ ঘোষ-এর মন্তব্যের মূল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে যখন সাংবাদিকরা রাজ্য জুড়ে চলা মহিলাদের বিক্ষোভ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। মন্ত্রী জবাবে বলেন, ‘অভ্যাস হয়ে গিয়েছে লক্ষ্মীর ভাণ্ডার নিয়ে। কিন্তু এটাও সকলের জানা উচিত যে, সব সরকারি সুবিধা সব নাগরিকের জন্য নয়। কেন্দ্রীয় সরকার নানান জনকल्याणমূলক প্রকল্প করেছে, আবার রাজ্য সরকারও করেছে। কিন্তু প্রতিটা সরকারি অনুদানের একটা সুনির্দিষ্ট সীমানা রয়েছে। এর জন্য কঠোর ক্রাইটেরিয়া ঠিক করা আছে। এর মধ্যে যাঁরা যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন, তাঁরা অবশ্যই টাকা পাবেন। তবে দানধ্যান হিসেবে সবাইকে ঢালাও টাকা দেওয়া হবে—এই খারাপ অভ্যাসটা তৈরি করে দিয়েছে তৃণমূল কংগ্রেস। এটা সবাইকে বুঝতে হবে, এমন ব্যবস্থা দিনের পর দিন চলতে পারে না।’
প্রাশাসনের আশ্বাস এবং বাস্তবে ক্ষোভের বিস্ফোরণ
ঠিক দুই সপ্তাহ আগে প্রশাসনের শীর্ষ স্তর থেকে রাজ্যবাসীকে আশ্বস্ত করে জানানো হয়েছিল যে, অন্নপূর্ণা যোজনার যোগ্য উপভোক্তা হিসেবে যাঁদের নাম নথিভুক্ত হয়েছে, তাঁদের অ্যাকাউন্টে নির্ধারিত সময় থেকে নিয়মিত টাকা পাঠানো শুরু হবে। কিন্তু নির্দেশিত তারিখ পেরিয়ে যাওয়ার পরও বহু মহিলার ব্যাংকে টাকা জমা না পড়ায় ক্ষোভের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন প্রশাসনিক এলাকা, রাজপথ ও পঞ্চায়েত কার্যালয়ের সামনে দফায় দফায় বিক্ষোভ-অবরোধ কর্মসূচি পালন করতে দেখা যায় সুবিধাবঞ্চিত মহিলাদের।
পশ্চিম মেদিনীপুরে অস্বস্তিতে পুরমন্ত্রী
বিক্ষোভের এই ধাক্কা এসে পৌঁছায় সরাসরি শাসকদলের নেতৃত্বের ওপর। মেদিনীপুরে বিশেষ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সফরে গিয়ে চরম অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। মেদিনীপুরের কর্নেলগোলার কাছাকাছি এলাকায় যখন স্থানীয় বিজেপি নেতা-কর্মীরা মন্ত্রীকে পুষ্পস্তবক দিয়ে স্বাগত জানাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই ভিড়ের পাশ থেকে একাধিক মহিলা চেঁচিয়ে বলতে শুরু করেন, ‘দিদি, আমরা অন্নপূর্ণা ভাণ্ডারের ৩ হাজার টাকা পাচ্ছি না কেন?’
হঠাৎ এমন অপ্রস্তুত প্রশ্নের মুখে পড়ে দৃশ্যত অস্বস্তিতে পড়ে যান পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তবে সামলে নিয়ে তিনি মহিলাদের আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেন এবং সমস্ত সমস্যার কথা অবিলম্বে স্থানীয় বিধায়কের কাছে লিখিতভাবে জানানোর পরামর্শ দেন।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
অন্নপূর্ণা যোজনা দিলীপ ঘোষ এবং তাঁর দলের অর্থনৈতিক কাঠামোর নতুন বার্তা বহন করছে। বিরোধীদের দাবি, রাজ্যবাসীকে বিনামূল্যে ভাতা দেওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, সেখান থেকে বাজেট নিয়ন্ত্রণ করতেই এখন নতুন নতুন শর্ত চাপানো হচ্ছে। তবে পঞ্চায়েতমন্ত্রীর সাফ যুক্তি, সরকারি কোষাগারের সঠিক ব্যবহারের জন্য স্ক্রুটিনি বা যোগ্যতার যাচাইকরণ অত্যন্ত জরুরি।
সব মিলিয়ে, অন্নপূর্ণা যোজনা দিলীপ ঘোষ-এর এই মন্তব্য ঘিরে যেমন তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে রাজনৈতিক চাপানউতোর তুঙ্গে উঠেছে, তেমনই পাড়ায় পাড়ায় সাধারণ মহিলাদের মধ্যে টাকার দাবিতে শুরু হওয়া ক্ষোভ আগামী দিনে সরকারের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হতে চলেছে।

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।
