Breaking
16 Sep 2026, Wed

রসিক চন্দ্র মণ্ডল: ১০৫ বছরের প্রবীণতম বন্দির মুক্তি দিল সুপ্রিম কোর্ট, সমাপ্ত ৩৮ বছরের দীর্ঘ আইনি অধ্যায়

১০৫ বছর বয়সে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে সম্পূর্ণ মুক্ত মালদহের বাসিন্দা রসিক চন্দ্র মণ্ডল

রসিক চন্দ্র মণ্ডল—পশ্চিমবঙ্গের জেলের ইতিহাসের প্রবীণতম বন্দি ১০৫ বছর বয়সে স্থায়ী মুক্তি পেলেন। সুপ্রিম কোর্ট তাঁর বাকি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড মকুব করেছে। বিস্তারিত পড়ুন primeinsight.in-এ।

মালদহ: রসিক চন্দ্র মণ্ডল (Rasik Chandra Mondal)—পশ্চিমবঙ্গের কারাবাসের ইতিহাসে এক অত্যন্ত পরিচিত ও আলোচিত নাম। দীর্ঘ সময় জেল খাটার পর, জীবনের শেষ প্রহরে এসে কারাগারের চার দেয়াল থেকে চিরতরে স্থায়ী মুক্তি পেলেন তিনি। দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের (Supreme Court) প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার সমন্বয়ে গঠিত তিন বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চ তাঁর অতি বার্ধক্য ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে বাকি কারাদণ্ড সম্পূর্ণ মকুব করে দিয়েছে। এর ফলে ১০৫ বছর বয়সে একজন স্বাধীন ও মুক্ত নাগরিক হিসেবে নিজের পরিবার ও প্রিয়জনদের কাছে থাকার সুযোগ পেলেন মালদহ জেলার মানিকচকের এই শতায়ু বাসিন্দা।

পারিবারিক বিবাদ, হত্যা ও রসিক চন্দ্র মণ্ডল-এর কারাবাস

রসিক চন্দ্র মণ্ডল-এর এই বহুল চর্চিত আইনি লড়াইয়ের সূচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় ৩৮ বছর আগে, ১৯৮৮ সালে। ১৯২০ সালে জন্ম নেওয়া রসিক চন্দ্র মণ্ডল মালদহ জেলার মানিকচক থানা এলাকার বাসিন্দা। ১৯৮৮ সালের নভেম্বর মাসে জমিজমা ও পারিবারিক সম্পত্তি সংক্রান্ত বিবাদের জেরে তাঁর ভাই সুরেশ মণ্ডল খুন হন। ওই ঘটনায় রসিক চন্দ্র মণ্ডল, তাঁর তিন পুত্র ও আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে খুনের অভিযোগ ওঠে এবং পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে।

ঘটনার সময় রসিক চন্দ্র মণ্ডল-এর বয়স ছিল ৬৮ বছর। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ১৯৯৪ সালে মালদহের নিম্ন আদালত (Trial Court) তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের নির্দেশ দেয়। সাজা ঘোষণার সময় তাঁর বয়স ছিল ৭৪ বছর। যে বয়সে মানু্ষ পরিবার ও নাতি-নাতনিদের সঙ্গে সময় কাটায়, সেই বয়সে এসে তাঁকে ঢুকে যেতে হয় জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে।

হাইকোর্ট থেকে সুপ্রিম কোর্ট: বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘ পথচলা

নিম্ন আদালতের সাজাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিলেন রসিক চন্দ্র মণ্ডল কিন্তু দীর্ঘ কয়েক দশক ঝুলন্ত থাকার পর, ২০১৮ সালে কলকাতা হাইকোর্ট (Calcutta High Court) তাঁর আপিল আবেদন খারিজ করে দেয় এবং নিম্ন আদালতের সাজাই বহাল রাখে। ২০১৯ সালে সুপ্রিম কোর্টেও তাঁর দায়ের করা বিশেষ অনুমতি আবেদন (SLP) খারিজ হয়ে যায়।

তবে সময় গড়ালেও রসিক চন্দ্র মণ্ডল-এর শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হতে শুরু করে, হাঁটাচলার ক্ষমতা নষ্ট হয় এবং বার্ধক্যজনিত একাধিক রোগ ব্যাধিতে তিনি আক্রান্ত হয়ে পড়েন। ২০২০ সালে, যখন রসিক চন্দ্র মণ্ডল-এর বয়স ৯৯ বছর, তখন তিনি সংবিধানের ৩২ নম্বর ধারা অনুযায়ী সুপ্রিম কোর্টে পুনর্বার আর্জি জানান এবং স্বাস্থ্যের কারণে ‘প্যারোল’ ও ‘অকাল মুক্তি’ (Premature Release) প্রার্থনা করেন।

সুপ্রিম কোর্টের দীর্ঘ আইনি পর্যালোচনার পর, ২০২৪ সালের ২৯ নভেম্বর দেশের সর্বোচ্চ আদালত তাঁকে শর্তসাপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন জামিনে (Interim Bail) মুক্তি প্রদান করে। বালুরঘাট সংশোধনাকার থেকে বের হয়ে তিনি মালদহে নিজের বাড়িতে পরিবারের সাথেই অবস্থান করছিলেন।

সময়কাল / বছর আইনি ঘটনা ও পরিস্থিতি রসিক চন্দ্র মণ্ডল-এর বয়স
১৯২০ জন্ম (পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায়) ০ বছর
১৯৮৮ ভাই সুরেশ মণ্ডল খুনের মামলায় গ্রেফতার ৬৮ বছর
১৯৯৪ নিম্ন আদালত কর্তৃক যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ঘোষণা ৭৪ বছর
২০১৮ কলকাতা হাইকোর্টে সাজা বহাল রাখা ৯৮ বছর
২০২৪ (২৯ নভেম্বর) সুপ্রিম কোর্টে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন লাভ ১০৪ বছর
২০২৬ (আগস্ট) সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক চূড়ান্ত ও স্থায়ী মুক্তি ১০৫ বছর

“উনি কি এখনও জীবিত আছেন?”—সুপ্রিম কোর্টের আবেগঘন শুনানি

সুপ্রিম কোর্টে মামলার চূড়ান্ত শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত কৌতুহল প্রকাশ করে আইনজীবীকে জিজ্ঞেস করেন, “আবেদনকারী রসিক চন্দ্র মণ্ডল কি এখনও জীবিত আছেন?”

জবাবে রসিক চন্দ্র মণ্ডল-এর আইনজীবী জে. পি. ধান্ডা (JP Dhanda) আদালতকে জানান যে, ১০৫ বছর বয়সেও রসিক চন্দ্র মণ্ডল জীবিত রয়েছেন, তবে অত্যন্ত অসুস্থ এবং সম্পূর্ণ শয্যাশায়ী।

রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকেও তাঁর বয়সের বিষ বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের কাছে নিশ্চিত করা হলে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেন, “আবেদনকারীর বয়স বিবেচনা করে আমরা এই দীর্ঘ মামলার ইতি টানছি এবং তাঁর বাকি সাজা মকুব করছি।” প্রধান বিচারপতি স্পষ্ট করেন, যদি তাঁর সাজা আইনিভাবে এখনও বাকি থেকে থাকে, তাহলেও ১০৫ বছর বয়সি রসিক চন্দ্র মণ্ডল-কে আর সংশোধনাকারে ফেরানো হবে না। ২০২৪ সালে দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশকেই স্থায়ী রায় হিসেবে ঘোষণা করে আদালত মামলাটির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করে।

বিচারব্যবস্থায় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির অনন্য নজির

আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রসিক চন্দ্র মণ্ডল-এর এই মামলাটি ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে এক অত্যন্ত অনন্য ও মানবিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হবে। অপরাধের সাজা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অতি বার্ধক্য ও অসুস্থতায় বন্দির প্রতি মানবিক আচরণ করাও যে আইনের একটি অন্যতম ভিত্তি, সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ে তা আরও একবার স্পষ্ট হলো।

সুপ্রিম আদালতের এই চূড়ান্ত নির্দেশের পর মালদহে রসিক চন্দ্র মণ্ডল-এর পরিবারে স্বস্তির নিঃশ্বাস পড়েছে। শতবর্ষ পার করে জীবনের শেষ দিনগুলো প্রিয়জনদের সান্নিধ্যে কাটানোর যে অনুমতি মিলল, তা প্রশাসনিক ও আইনি ইতিহাসে নজির হয়ে থাকবে।

By Tanmay

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।

Leave a Reply

Enable Notifications No Allow