উত্তর কোরিয়ার মিসাইল পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হলো নতুন উত্তেজনা। ট্রাম্প সামরিক মহড়া কমানোর ঘোষণা ও শান্তির বার্তা দিলেও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে কড়া জবাব দিল পিয়ংইয়ং।
টোকিও: উত্তর কোরিয়ার মিসাইল পরীক্ষা ঘিরে কোরীয় উপদ্বীপে আবারও নতুন করে সামরিক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি নিজেদের সুর কিছুটা ‘নরম’ করে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ার ব্যাপ্তি ও সময়সীমা কমানোর নির্দেশনা দিয়েছিলেন। কিন্তু ওয়াশিংটনের সেই আপাত কৌশলগত পদক্ষেপকে তোয়াক্কা না করে এবার পূর্ব উপকূলে পর পর কয়েকটি ‘রহস্যময়’ প্রজেক্টাইল নিক্ষেপ করল উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার এই অপ্রত্যাশিত ও আগ্রাসী সামরিক পদক্ষেপের কথা স্বীকার করেছে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা দফতর।
জাপানের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এক বিশেষ জরুরি বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা উত্তর কোরিয়ার সন্দেহজনক ও কৌশলগত উৎক্ষেপণ শনাক্ত করতে সক্ষম হয়েছে। যদিও উৎক্ষেপণ করা মিসাইলের গতিপথ ও সুনির্দিষ্ট ধরণ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্যের জন্য অনুসন্ধান চালানো হচ্ছে বলে টোকিও সতর্ক করেছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক সূত্রের তথ্য উদ্ধৃত করে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, পিয়ংইয়ং তাদের পূর্ব উপকূল অভিমুখে অন্তত কয়েকটি অজ্ঞাত প্রজেক্টাইল ও স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে।
সামরিক মহড়া কমালেও বদলাবে না মনোভাব: কিমের বোন
এই সামরিক ঘটনার ঠিক আগেই উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের অত্যন্ত প্রভাবশালী বোন কিম ইয়ো জং ওয়াশিংটনের তথাকথিত কৌশলগত নমনীয়তাকে প্রকাশ্যে খারিজ করে দেন। তিনি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছিলেন, “যৌথ সামরিক মহড়ার সময়সীমা ও পরিসর কমানো হলেও এর উসকানিমূলক এবং আগ্রাসী মূল চরিত্র কখনও বদলাবে না”।
কিম ইয়ো জং আরও যোগ করে বলেন, “আমেরিকা মনে করতেই পারে যে তাদের সাম্প্রতিক মহড়া কমানোর সিদ্ধান্তটিকে তারা তথাকথিত ‘সদিচ্ছা’র নিদর্শন হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তুলে ধরতে পারবে। কিন্তু পিয়ংইয়ংয়ের কাছ থেকে তারা এমন কোনো কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক সাড়া পাবে না”। সেই সঙ্গেই তিনি চলতি বছরের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত আমেরিকা-দক্ষিণ কোরিয়ার যৌথ সামরিক মহড়ার কৌশলগত আগ্রাসনের বিষয়টি পুনঃস্মরণ করিয়ে দেন।
ট্রাম্পের ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ বার্তা ও নরম সুর
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ কিম জং উনের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কের কথা তুলে ধরে একটি বিষদ পোস্ট করেন। সেখানে তিনি লেখেন, “উত্তর কোরিয়ার কিম জং উনের সঙ্গে আমার অত্যন্ত চমৎকার সম্পর্কের কারণে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যৌথ সামরিক মহড়ায় আমেরিকার দীর্ঘদিনের অংশগ্রহণের বিষয়টি আমার কাছে সন্তোষজনক মনে হচ্ছে না।”
ট্রাম্প তাঁর দীর্ঘ পোস্টে আরও যুক্তি দিয়ে দাবি করেন, “এই ধরনের যৌথ সামরিক মহড়াগুলি কেবল যে অতিরিক্ত ব্যয়বহুল তা-ই নয়, যার সিংহভাগ খরচ (বরাবরের মতোই) আমেরিকাকেই বহন করতে হয়— বরং এগুলি এমন একটি দেশের প্রতি সম্পূর্ণ অনুপযুক্ত ও শত্রুভাবাপন্ন বার্তা পাঠায়, যারা ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন কোনো হুমকি তৈরি করেনি এবং সর্বদা শ্রদ্ধাশীল আচরণই প্রদর্শন করেছে।”
ট্রাম্পের এমন নাটকীয় মন্তব্য প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্ব রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। হঠাৎ কেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি এতটা নরম ও নমনীয় মনোভাব দেখাচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহল চরম বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। ট্রাম্প এমনকি পেন্টাগনকে বার্ষিক যৌথ মহড়ার সময়সীমা কমিয়ে প্রায় অর্ধেক করে দেওয়ার পরোক্ষ বার্তা দেন।
বিশ্ব রাজনীতিতে উত্তর কোরিয়ার মিসাইল পরীক্ষার প্রভাব
পেন্টাগন এবং আন্তর্জাতিক সামরিক পর্যবেক্ষকদের মতে, কোরীয় উপদ্বীপের সংঘাতময় পরিস্থিতি শান্ত করতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিভিন্ন সময় কূটনীতির পথ নিলেও, উত্তর কোরিয়া তাদের পারমাণবিক ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের কৌশল থেকে পিছু হটছে না। বহুবার নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রাষ্ট্রটি প্রতিনিয়ত নিজেদের আধুনিক প্রযুক্তির অস্ত্রভাণ্ডার মজবুত করে চলেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্পের বার্তা সত্ত্বেও এই ধরণের উত্তর কোরিয়ার মিসাইল পরীক্ষা প্রমাণ করে যে, পিয়ংইয়ং কেবল কোনো মুখের কথা বা সামরিক ছাড়ের সাময়িক ঘোষণায় সন্তুষ্ট নয়। তারা চায় যুক্তরাষ্ট্র যেন কোরীয় উপদ্বীপে তাদের সমস্ত সামরিক উপস্থিতি স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়।
কোরীয় উপদ্বীপের বাস্তব চিত্র অপরিবর্তিত
পিয়ংইয়ং দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে, তাদের সীমান্ত অঞ্চলে আমেরিকা ও দক্ষিণ কোরিয়ার পরিচালিত যে কোনো যৌথ সামরিক মহড়া মূলত উত্তর কোরিয়া দখলের একটি ছদ্ম অনুশীলন। ফলে মার্কিন প্রশাসন তাদের সামরিক মহড়ার আকার বা দিনক্ষণ ছোট করলেও, নিজেদের পারমাণবিক প্রতিরক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা উন্নত করার পথ থেকে উত্তর কোরিয়া সরবে না।
সাম্প্রতিক উত্তর কোরিয়ার মিসাইল পরীক্ষা এটাই প্রমাণ করে যে, দূরপ্রাচ্যের এই অঞ্চলে কূটনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এখনো ওয়াশিংটন ও তার সহযোগীদের জন্য এক বিশাল বড় চ্যালেঞ্জ। ভবিষ্যতে উত্তর কোরিয়ার এই আগ্রাসী মনোভাবের জবাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়া কী ধরণের সামরিক প্রতিক্রিয়া দেখায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।
