পাকিস্তান জেলে কেমন আছেন ইমরান খান? সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের শারীরিক অবস্থার অবনতি নিয়ে ছেলে কাসিম খানের উদ্বেগ।
করাচি: ইমরান খান-কে নিয়ে ফের উত্তাল আন্তর্জাতিক রাজনীতি। পাকিস্তানের প্রাক্তন ক্রিকেটার তথা দেশের প্রাক্তন রাষ্ট্রনেতার শারীরিক অবস্থার দিন দিন অবনতি ঘটছে। অডিয়ালা কারাগারে বন্দি ৭৩ বছর বয়সী এই নেতার স্বাস্থ্য নিয়ে সম্প্রতি গভীর উদ্বেগ ও আশঙ্কার কথা শোনালেন তাঁর দুই ছেলে—সুলেমান খান এবং কাসিম খান। বন্দিদশায় বাবার জীবন সংশয় তৈরি হয়েছে বলে সরাসরি অভিযোগ তুলেছেন তাঁরা।
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অমান্য ও সরকারি পদক্ষেপ
অনলাইনে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক সাংবাদিক বৈঠকে পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর ছেলেরা সরকারের বিরুদ্ধে মারাত্মক অভিযোগ তোলেন। তাঁদের দাবি, প্রশাসন দেশের সর্বোচ্চ আদালত অর্থাৎ সুপ্রিম কোর্টের স্পষ্ট নির্দেশিকাকেও কোনো তোয়াক্কা করছে না।
আদালতের নির্দেশে বলা হয়েছিল, বন্দি সাবেক অধিনায়কের শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে তাঁকে solicitudes অনুযায়ী কেন ইসলামাবাদের খ্যাতনামা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘শিফা ইন্টারন্যাশনাল হাসপাতালে’ উন্নত চিকিৎসার সুযোগ দেওয়া হবে না? এর পাশাপাশি, তাঁর শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে অবগত রাখতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের অনুমতি দেওয়ার কথা জানানো হয়েছিল।
তবে সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া এই মানবাধিকার ও চিকিৎসার নির্দেশিকা কার্যত ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। রাতের অন্ধকারে চরম গোপনীয়তা ও কড়া নিরাপত্তার বলয়ে তাঁকে শিফা হাসপাতালের বদলে একটি সরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে পাক সরকার দাবি করে যে পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী ক্যাপ্টেন সম্পূর্ণ সুস্থ ও সুরক্ষিত আছেন, কিন্তু সেই দাবিকে একবাক্যে খারিজ করেছেন তাঁর পরিবার ও অনুগামীরা।
কাসিম খানের উদ্বেগ ও আন্তর্জাতিক আইনজীবীর বক্তব্য
সাংবাদিক বৈঠকে পিটিআই (PTI) প্রধানের ছোট ছেলে কাসিম খান অত্যন্ত আবেগঘন ও আশঙ্কাজনক বার্তা দিয়েছেন। কাসিম বলেন, “এই মুহূর্তে পরিস্থিতি যা, তাতে মনে হচ্ছে কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় বাবার বেঁচে থাকার সম্ভাবনার চেয়ে না বাঁচার আশঙ্কাই অনেক বেশি।”
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পিটিআই প্রধানের আইনি লড়াই পরিচালনাকারী বিশিষ্ট আইনজীবী জ্যারেড জেনসার এই কারাবাসকে সাধারণ সাজা না বলে ‘স্লো-মোশন মার্ডার’ বা ধুঁকে ধুঁকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র বলে আখ্যা দিয়েছেন। জেনসারের পেশ করা তথ্য অনুযায়ী:
-
সেলের আকার: সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে মাত্র ১.৮ মিটার বাই ২.৪ মিটারের (প্রায় ৬ বাই ৮ ফুট) অত্যন্ত সংকুচিত এক নির্জন প্রকোষ্ঠে বন্দি রাখা হয়েছে।
-
প্রাকৃতিক আলোর অভাব: ২৪ ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ২৩ ঘণ্টা তাঁকে সূর্য বা প্রাকৃতিক আলো দেখতে দেওয়া হয় না।
-
একাকী বন্দিত্ব: সম্পূর্ণ সমাজ ও বাহিরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে একপ্রকার নির্জন কারাবাস বা ‘সলিটারি কনफाइनমেন্ট’-এ রাখা হয়েছে পাকিস্তানের এই জনপ্রিয় নেতাকে।
দীর্ঘদিনের অসুস্থতা ও সাক্ষাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা
৭৩ বছর বয়সী এই রাজনীতিক বর্তমানে বেশ কয়েকটি জটিল শারীরিক ব্যাধিতে ভুগছেন। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত আলো না পাওয়ায় এবং কারাবাসের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের কারণে তাঁর ডান চোখে গুরুতর দৃষ্টিসংক্রান্ত সমস্যা (Retinal Vein Occlusion) দেখা দিয়েছে। চিকিৎসকদের একাংশ অবিলম্বে তাঁর সঠিক পরিচর্যার পরামর্শ দিলেও প্রশাসনিক জটিলতায় তা আটকে রয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাজ্যে বসবাসকারী সুলেমান ও কাসিম জানান, দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা সত্ত্বেও পাকিস্তান প্রশাসন তাঁদের বাবার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি দিচ্ছে না। ২০২২ সালের নভেম্বর মাসে শেষবার তাঁরা সশরীরে বাবার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রায় চার বছর কেটে গেলেও সরাসরি যোগাযোগের পথ বন্ধ থাকায় তাঁদের ক্ষোভ চরমে পৌঁছেছে।
রাজনৈতিক ইতিহাস ও বর্তমান আইনি লড়াই
প্রসঙ্গত, ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপজয়ী ক্রিকেট অধিনায়ক থেকে পাকিস্তানের সরকারপ্রধান হয়ে ওঠা ইমরান খান-কে ২০২৩ সালে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি তথ্য ফাঁস (সাইফার মামলা), তোশাখানা দুর্নীতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারসহ একাধিক অভিযোগ এনে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
তবে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং তাঁর রাজনৈতিক দল ‘পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ’ (PTI) শুরু থেকেই এই সমস্ত অভিযোগ রাজনীতিপ্রসূত এবং মিথ্যা বলে দাবি করে আসছে। সমর্থকদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণেই তাঁদের নেতিকে অন্যায়ভাবে কারাগারে বন্দি রেখে স্বাস্থ্যের তোয়াক্কা না করে নির্যাতন চালানো হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলিও পাকিস্তান সরকারের কাছে বারবার আবেদন জানাচ্ছে, কিন্তু স্বাস্থ্যের অবনতির খবরে বিশ্ব রাজনীতিতে উদ্বেগ বেড়েই চলেছে।

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন।
সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।
