Breaking
16 Sep 2026, Wed

সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ভারতের কঠোর অবস্থানে ব্যাকফুটে পাকিস্তান, এবার আলোচনার আর্জি

সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ভারতের কঠোর অবস্থানে

সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে নেদারল্যান্ডসের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের রায় একতরফা খারিজ করল ভারত। এরপরই ব্যাকফুটে গিয়ে ভারতের সাথে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসতে চায় পাকিস্তান।

সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার কূটনৈতিক যুদ্ধ এবার এক নতুন ও অত্যন্ত জটিল মোড়ে এসে পৌঁছেছে। পহেলগাঁওয়ের নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার পর নয়াদিল্লি যখন ঐতিহাসিক ১৯৬০ সালের সিন্ধু জলচুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত বা ‘ইন অ্যাবেয়েন্স’ (in abeyance) রাখার নজিরবিহীন ঘোষণা দেয়, তখন থেকেই চরম আশঙ্কায় দিন গুনছিল ইসলামাবাদ। ভারতের এই পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে তড়িঘড়ি আন্তর্জাতিক আঙিনায় দৌড়ঝাঁপ শুরু করে পাকিস্তান। তবে নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগের আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত (Permanent Court of Arbitration) থেকে পাকিস্তানের অনুকূলে রায় আসলেও, সেই নির্দেশকে ভারতের নরেন্দ্র মোদি সরকার একঝটকায় ‘অবৈধ ও একতরফা’ বলে উড়িয়ে দেওয়ায় তীব্র কূটনৈতিক চাপে পড়েছে পাকিস্তান।

দ্য হেগের আদালতের রায় ও ভারতের কঠোর অবস্থান

গত ৩১ আগস্ট নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ-এ অবস্থিত সালিশি আদালত একটি সর্বসম্মত রায়ে জানায় যে, ১৯৬০ সালের বিশ্বব্যাঙ্কের মধ্যস্থতায় স্বাক্ষরিত সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত বা বাতিল করার মতো কোনো আইনি বা যুক্তিসঙ্গত কারণ ভারতের ছিল না। আদালতের দাবি, এই ঐতিহাসিক আন্তর্জাতিক চুক্তি এখনও পূর্ণরূপে কার্যকর রয়েছে এবং ভারত একতরফাভাবে এটি স্থগিত রাখতে পারে না। এমনকি জম্মু ও কাশ্মীরের রাতলে (Ratle) জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কিছু নির্দিষ্ট নির্মাণকাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার মধ্যবর্তী নির্দেশও জারি করে ওই ট্রাইব্যুনাল।

তবে ভারতের বিদেশ মন্ত্রক (MEA) আদালতের এই একতরফা সিদ্ধান্ত প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাফ জানিয়ে দিয়েছে যে, এই তথাকথিত সালিশি আদালতের আইনি কোনো বৈধতাই ভারত স্বীকার করে না। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র বলেন, বিশ্বব্যাঙ্কের মূল শর্তাবলী লঙ্ঘন করে পাকিস্তান ও আন্তর্জাতিক কিছু স্বার্থগোষ্ঠী বেআইনিভাবে এই আদালত গঠন করেছিল। ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্ত এবং দেশের অভ্যন্তরীণ পরিকাঠামো বা জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের ওপর ছড়ি ঘোরানোর কোনো অধিকার বা এক্তিয়ার কোনো বেআইনি সংস্থার নেই। ভারত পরিষ্কার করে জানিয়ে দিয়েছে— “ভারতের সার্বভৌম সিদ্ধান্তই বহাল থাকবে এবং সিন্ধু জলচুক্তি স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত থেকে নয়াদিল্লি একচুলও সরবে না”।

ব্যাকফুটে পাকিস্তান: কেন হঠাৎ দ্বিপাক্ষিক আলোচনার আকুতি?

ভারতের এই কঠোর রূপ ও আন্তর্জাতিক আদালতের রায়কে সরাসরি পাত্তা না দেওয়ার নীতি পাকিস্তানকে চরম জলসংকটের আশঙ্কায় ফেলে দিয়েছে। পিটিআই (PTI) সংবাদসংস্থার প্রতিবেদন অনুযায়ী, তীব্র কূটনৈতিক চাপের মুখে পড়ে পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র তাহির আন্দরাবি বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে সম্পূর্ণ ভিন্ন সুর বাজিয়েছেন।

তাহির আন্দরাবি দাবি করেন, পাকিস্তান চুক্তিটি আক্ষরিক ও প্রকৃত অর্থে বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে আদালতের রায় বাস্তবায়নের দোহাই দিয়ে এবার তিনি বলেন, “চুক্তিটি যাতে যথাযথভাবে মেনে চলা হয় এবং দুই দেশের জলবণ্টন সমস্যার সুরাহা হয়, তার জন্য আমরা ভারতের সঙ্গে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসতে একপায়ে রাজি”। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্য হেগের আদালতের কোনো রায় বলবৎ করার মতো সামরিক বা নির্বাহী ক্ষমতা (Enforcement Mechanism) না থাকায়, কেবল কাগজের রায়ে ভারতের কিছু যায় আসে না বুঝতে পেরেই এখন নতিস্বীকার করে আলোচনার পথ খুঁজছে পাকিস্তান।

ঘটনা / পদক্ষেপ ভারতের অবস্থান
পহেলগাঁও জঙ্গি হামলা সন্ত্রাস বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত চুক্তি স্থগিত
দ্য হেগের সালিশি আদালতের রায় আদালত অবৈধ, রায় চূড়ান্তভাবে বাতিল
পাকিস্তানের দ্বিপাক্ষিক আলোচনার প্রস্তাব রক্ত ও জল একসাথে বইতে পারে না

“রক্ত এবং জল একসাথে বইতে পারে না”: ভারতের চিরন্তন বার্তা

ভারতের বিদেশ মন্ত্রক ও রাষ্ট্রসংঘের মঞ্চে ভারতীয় প্রতিনিধিদের বার্তা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। জাতিসংঘে ভারতের স্থায়ী প্রতিনিধি পি হরিশ বিশ্ব জল দিবসের এক অনুষ্ঠানে আগেই স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলেন, “সিন্ধু জলচুক্তি-র পবিত্রতা রক্ষার কথা বলার আগে পাকিস্তানকে অবশ্যই মানব জীবনের পবিত্রতা বজায় রাখতে হবে”। সীমান্তে একের পর এক জঙ্গি হামলা ও প্রক্সি ওয়ার চালিয়ে পাকিস্তান যেভাবে ভারতীয় নাগরিকদের জীবন ছিনিয়ে নিচ্ছে, সেখানে কূটনৈতিক সৌজন্য বা চুক্তি রক্ষা করা অসম্ভব।

পাকিস্তান ১৯৬০ সালের চুক্তির দোহাই দিয়ে ভিয়েনা কনভেনশনের নিয়মভঙ্গের অভিযোগ আনলেও, ভারতের বক্তব্য অত্যন্ত পরিষ্কার— বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের উৎপত্তিস্থল পাকিস্তান যতক্ষণ না সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এবং জঙ্গি মদত বন্ধ করছে, ততক্ষণ সিন্ধু জলচুক্তি নিয়ে কোনো কথা বা দ্বিপাক্ষিক আলোচনা সম্ভব নয়।

সম্পর্কিত দরকারী সংযোগসমূহ (Links):

By Tanmay

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।

Leave a Reply

Enable Notifications No Allow