Breaking
16 Sep 2026, Wed

ইউক্রেনে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা তীব্র রূপ নিয়েছে। ভারতীয় ধনকুবের লক্ষ্মী মিত্তলের মালিকানাধীন ইউক্রেনের বৃহত্তম স্টিল কারখানা আর্সেলর মিত্তলে ভয়াবহ রকেট অ্যাটাক।

কিয়েভ: ইউক্রেনে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং দূরপাল্লার বিমান আক্রমণের তীব্রতা নতুন করে বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। দুই দেশের মধ্যবর্তী সংঘাতের আঁচে এবার সরাসরি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়লেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিশ্বখ্যাত শিল্পপতি লক্ষ্মী মিত্তল। ইউক্রেনের মধ্যভাগে অবস্থিত ঐতিহাসিক শিল্পশহর এবং প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির জন্মস্থান ক্রিভি রিহ-তে ভয়াবহ রকেট আক্রমণ চালিয়েছে রুশ বাহিনী। ওই হামলায় সরাসরি নিশানা করা হয়েছে লক্ষ্মী মিত্তলের মালিকানাধীন ইউক্রেনের বৃহত্তম স্টিল কারখানা ‘আর্সেলর মিত্তল ক্রিভি রিহ’ (ArcelorMittal Kryvyi Rih)-কে।

হামলার পরপরই অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় কারখানা চত্বরে। স্টিল প্ল্যান্ট কর্তৃপক্ষের প্রাথমিক বিবৃতি অনুযায়ী, ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই ২ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। একই সঙ্গে অন্তত ১৩ জন কর্মী এবং ঠিকাদার সংস্থার সদস্য গুরুতর আহত হয়েছেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ার ফলে দেশের অন্যতম প্রধান এই অর্থনৈতিক পরিকাঠামো মারাত্মক চাপে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

আর্সেলর মিত্তল স্টিল প্ল্যান্টে কতখানি ক্ষতি হলো?

ক্রিভি রিহ শহরে অবস্থিত এই বিশাল স্টিল প্ল্যান্টটি শুধু ইউক্রেনের অন্যতম প্রধান শিল্প ক্ষেত্রই নয়, এটি দেশটির জাতীয় অর্থনীতি এবং পরিকাঠামোগত সুরক্ষার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ।

নিজের অফিশিয়াল টেলিগ্রাম বার্তায় এবং বিবৃতিতে আর্সেলর মিত্তল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, রকেটের সরাসরি আঘাতে কারখানার বিদ্যুৎ সরবরাহ কেন্দ্র এবং মূল ব্লাস্ট ফার্নেস (Blast Furnace) উৎপাদন ব্যবস্থার মারাত্মক ক্ষতি হয়েছে।

বিবৃতিতে কোম্পানিটি জানায়:

“রুশ হামলার ফলে কারখানার বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এবং ব্লাস্ট ফার্নেস জোনের প্রধান প্রধান অংশগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতার কারণে কারখানার সামগ্রিক উৎপাদন প্রক্রিয়া আংশিকভাবে স্থগিত রাখতে হয়েছে।”

হামলার পরপরই দ্রুত উদ্ধারকাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিস, উদ্ধারকারী দল এবং জরুরি চিকিৎসাকর্মীরা। ধ্বংসস্তূপ থেকে আহতদের উদ্ধার করে শহরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে প্রকৌশলী ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের একটি দল ক্ষয়ক্ষতির পরিমাপ নির্ধারণে কাজ করছেন। বিদ্যুৎ সংযোগ পুনরায় স্থাপন করে কারখানার উৎপাদন কবে স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে এখনই সুনির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেনি কারখানা কর্তৃপক্ষ।

ড্রোন হামলার বদলা নিতেই এই আঘাত?

সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেনে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মূলত ইউক্রেনীয় বাহিনীর সাম্প্রতিক ড্রোন আক্রমণের পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগেই ইউক্রেনের সামরিক বাহিনী রাশিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে ৮০০টিরও বেশি দীর্ঘপাল্লার ড্রোন প্রয়োগ করে এক নজিরবিহীন আক্রমণ চালায়। মস্কো সহ একাধিক রুশ শিল্প কেন্দ্র ও সামরিক ঘাঁটিকে লক্ষ্য করে সেই হামলা চালানো হয়েছিল।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রক দাবি করেছে, তারা আকাশপথেই ৮২২টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ধ্বংস করতে সক্ষম হয়েছে। তবে এই বিশাল বিমান আক্রমণের পরই ইউক্রেনের বেসামরিক পরিকাঠামো ও শিল্প কারখানায় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে পাল্টা হামলা চালায় মস্কো।

প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির প্রতিক্রিয়া

নিজের জন্মশহরে এই বিধ্বংসী আক্রমণের পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি তিনি জানান, রাশিয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সাধারণ নাগরিকদের জীবন ও দেশের অর্থব্যবস্থাকে পঙ্গু করার ষড়যন্ত্র করছে।

জেলেনস্কি বলেন:

“যেখানেই রুশ বাহিনী তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল নিয়ে পৌঁছাতে পারছে, সেখানেই সাধারণ নাগরিক ও শিল্পের পরিকাঠামোকে নিশানা বানাচ্ছে। শুধুমাত্র চলতি সপ্তাহে ১৩টিরও বেশি অঞ্চলে ১,৫৫০টির বেশি ড্রোন, ১,৫৬০টি গাইডেড বোমা এবং ৬২টি বিভিন্ন ধরনের মিসাইল নিক্ষেপ করেছে প্রতিপক্ষ।”

কারখানাটি ছাড়াও ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভ এবং ক্রেমেনচুক এলাকাতেও একই রাতে রাশিয়া থেকে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। কিয়েভে হামলায় বিশাল অগ্নিকাণ্ডের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন নাগরিক আহত হয়েছেন।

ইউক্রেন-রাশিয়া সংঘাতের ভবিষ্যৎ

রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চার বছর অতিক্রম করে এখন আরও বেশি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। সীমান্ত যুদ্ধের পাশাপাশি উভয় দেশই এখন প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক ও সামরিক পরিকাঠামো ধ্বংস করতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ইউক্রেনে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা একদিকে যেমন বিশ্বখ্যাত স্টিল কারখানা আর্সেলর মিত্তল এবং ভারতীয় শিল্পপতি লক্ষ্মী মিত্তলের ব্যবসায়িক স্বার্থে প্রভাব ফেলছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারেও ইস্পাত সরবরাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলার আশঙ্কা প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।

একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (EU) রাশিয়ার উপর আরও নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জারি করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে যুদ্ধ কমার কোনো লক্ষণ না থাকায় বিশ্ব অর্থনীতি ও শিল্পক্ষেত্রের ওপর এই সংঘাতের কালো ছায়া আরও দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

By Tanmay

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।

Leave a Reply

Enable Notifications No Allow