Breaking
16 Sep 2026, Wed

মোহন ভাগবতের নিউ ইয়র্কের ভাষণ: ‘যাঁরা ভাবেন ভারতে মুসলিমদের ঠাঁই নেই তাঁরা হিন্দুই নন’

নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়্যারে এক বিশ্ব এক মানবতা অনুষ্ঠানে মোহন ভাগবতের নিউ ইয়র্কের ভাষণ দেওয়ার দৃশ্য

মোহন ভাগবতের নিউ ইয়র্কের ভাষণ নিয়ে চর্চা তুঙ্গে। মার্কিন মুলুকে আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবত স্পষ্ট জানান, ভারতে মুসলিমদের বাদ দিয়ে হিন্দুত্বের কল্পনা ভুল।

নিউ ইয়র্ক: মোহন ভাগবতের নিউ ইয়র্কের ভাষণ বিশ্ব রাজনীতি এবং ভারতীয় সামাজিক প্রেক্ষাপটে এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকল। মার্কিন মুলুকে দাঁড়িয়ে বিশ্ব মানবতার বার্তা দিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সরসংঘচালক মোহন ভাগবত। নিউ ইয়র্কের ঐতিহাসিক ম্যাডিসন স্কোয়্যারে আয়োজিত ‘এক বিশ্ব, এক মানবতা’ (One World, One Humanity) শীর্ষক আলোচনা সভায় তিনি সাফ জানান, ভারতে মুসলিমদের বাদ দিয়ে হিন্দুত্বের কল্পনা করা যায় না।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “আপনি যদি নিজেকে হিন্দু বলে মনে করেন, তাহলে আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে যে সব পথ একই লক্ষ্যে পৌঁছায়। প্রতিটি মানুষের নিজস্ব আত্মমর্যাদা রয়েছে। মানুষে মানুষে কোনো বিভেদ নেই। যে হিন্দুরা মনে করেন ভারত থেকে মুসলিমদের বের করে দেওয়া উচিত, তাঁরা হিন্দুত্বের মূল ধারণার সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তাঁরা আদতে হিন্দুই নন।”

ধর্মনিরপেক্ষতা ও মানবতার বার্তা: মোহন ভাগবতের নিউ ইয়র্কের ভাষণ

নিউ ইয়র্কের এই বিশেষ অনুষ্ঠানে প্রায় ৫,০০০ আন্তর্জাতিক শ্রোতার সমাগম ঘটেছিল। সেখানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে সংঘপ্রধান ভারতের বহুত্ববাদী সংস্কৃতির কথা বিস্তারিত তুলে ধরেন। মোহন ভাগবতের নিউ ইয়র্কের ভাষণ স্পষ্ট করে দেয় যে উপাসনার পদ্ধতি ভিন্ন হলেও মানবতার মূল সত্য একটিই।

ভাগবতের কথায়, “পৃথিবীতে বহু ধর্ম রয়েছে। প্রতিটি ধর্মের নিজস্ব নিয়মকানুন ও অনুশাসন রয়েছে। কিন্তু অন্যের ধর্মের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা কোনোভাবেই হিন্দুত্ব হতে পারে না। শেষ সত্য ও মানবতা এক।”

অনুষ্ঠানে এক সাংবাদিকের সরাসরি প্রশ্নের উত্তরে তিনি ২০১৮ সালের দিল্লির একটি সভার কথাও উল্লেখ করেন। সেখানে মুসলিম সমাজ থেকে হিন্দুরাষ্ট্রের ধারণায় তাঁদের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল। সেই কথা স্মরণ করিয়ে ভাগবত বলেন, “আমি তখনও বলেছিলাম এবং আজও বলছি—মুসলিমদের বাদ দিয়ে ভারতের অস্তিত্ব হয় না। কারণ হিন্দু শব্দটির সাথেই সার্বিক গ্রহণযোগ্যতা ও সমন্বয় যুক্ত।”

আরএসএস-এর সেবা প্রকল্প ও অসাম্প্রদায়িক উদ্ধারকাজ

আলোচনা সভায় আরএসএস প্রধান জোর দিয়ে বলেন যে সংঘ মূলত একটি সামাজিক ও সেবা সংগঠন। সংঘের সেবাকাজে ধর্ম, বর্ণ বা জাতি দেখে কোনো বৈষম্য করা হয় না। নিজের বক্তব্যের সপক্ষে তিনি ১৯৯৬ সালে হরিয়ানার দাদারিতে হওয়া মর্মান্তিক বিমান দুর্ঘটনার উদাহরণ টানেন।

“দাদারির বিমান দুর্ঘটনায় দুটি মুসলিম দেশের বিমান জড়িয়ে পড়েছিল এবং নিহতরা সবাই ছিলেন মুসলিম ধর্মাবলম্বী। সেই সময় আমাদের স্বয়ংসেবকরা প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ চালান এবং সম্মানজনক সৎকারের ব্যবস্থা করেন। বিপদের সময় মানুষের ধর্ম বিচার করা আমাদের আদর্শের পরিপন্থী।” — মোহন ভাগবত

আন্তর্জাতিক মঞ্চে মোহন ভাগবতের নিউ ইয়র্কের ভাষণ ভারতে সামাজিক অসংহতি এবং অসহিষ্ণুতার অভিযোগ তোলা সমালোচকদের কড়া জবাব দিয়েছে বলে কূটনৈতিক মহল মনে করছে।

সমালোচকদের জবাব ও বিতর্কিত প্রেক্ষাপট

এই অনুষ্ঠানের আগে কিছু রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক মহল থেকে অনুষ্ঠান বাতিল করার চেষ্টা করা হয়েছিল। নিউ ইয়র্কের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি জোহরান মামদানি এবং আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত আমেরিকান কমিশনের (USCIRF) কিছু সদস্য ভাগবতের এই মার্কিন সফরের বিরোধিতা করেছিলেন। তবে সমস্ত বিতর্ক উপেক্ষা করেই বিপুল জনসমাগমে সম্পন্ন হয় এই আন্তর্জাতিক সভা।

মোহন ভাগবতের নিউ ইয়র্কের ভাষণ আরও একবার প্রমাণ করল যে সার্বিক সম্প্রীতি ও বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য রক্ষায় ভারত বিশ্বকে পথ দেখাতে সক্ষম। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনীতিতে এই বক্তব্যের প্রভাব সুদূরপ্রসারী হতে চলেছে। বিশ্ব দরবারে ভারতের চিরাচরিত “বসুধৈব कुटुंबকম” (সমগ্র বিশ্বই এক পরিবার) দর্শনকেই পুনরায় প্রতিষ্ঠিত করলেন সংঘপ্রধান।

By Tanmay

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।

Leave a Reply

Enable Notifications No Allow