Breaking
16 Sep 2026, Wed

Modi Government India Economy Report: গবেষণায় উঠে এল মাথাপিছু আয় ও স্বাধীনতার চাঞ্চল্যকর তথ্য

Modi Government India Economy Report

Modi Government India Economy Report নিয়ে আমেরিকার টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটির দুই গবেষকের পেপারে তৈরি হলো নতুন বিতর্ক। ২০২৪-২০২৬ পর্যালোচনায় মাথাপিছু আয় ও ১০টি সূচকে ভারত কোথায়?

প্রাইম ইনসাইট ডেস্ক: Modi Government India Economy Report নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও অর্থনীতির অঙ্গনে এক নতুন এবং উত্তপ্ত বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। আমেরিকার বিখ্যাত টেক্সাস টেক ইউনিভার্সিটির (Texas Tech University) রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ কেভিন গ্রিয়ার (Kevin Grier) এবং কৃষি ও প্রয়োগ অর্থনীতি বিভাগের রবিন গ্রিয়ার (Robin Grier) সম্প্রতি যৌথভাবে একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী গবেষণাপত্র প্রকাশ করেছেন।

গবেষণাপত্রটির শিরোনাম দেওয়া হয়েছে—Promises, Promises: Governance and Growth in India under Modi and the BJP ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) ও নরেন্দ্র মোদী ‘অচ্ছে দিন’, ‘গুজরাট মডেল’ এবং ‘মিনিমাম গভর্নমেন্ট, ম্যাক্সিমাম গভর্ন্যান্স’-এর মতো যে সমস্ত উন্নয়ন ও স্বচ্ছ সুশাসনের রূপরেখা তুলে ধরেছিলেন, গত এক দশকে তার বাস্তব অগ্রগতি কতটা হয়েছে—তা গাণিতিকভাবে বিশ্লেষণ করাই এই গবেষণার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল।

Modi Government India Economy Report
নরেন্দ্র মোদী এবং ভারতের অর্থনৈতিক উন্নয়ন. (Source: Facebook)

গবেষকদ্বয়ের প্রাপ্ত পরিসংখ্যানগত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ক্ষমতার এই পরিবর্তনের পরিবর্তে ভারত যদি তার পূর্ববর্তী বিকাশ ও অগ্রগতির স্বাভাবিক ধারায় চলত, তবে ২০২৩-২০২৪ সাল নাগাদ দেশের প্রতি নাগরিকের বার্ষিক মাথাপিছু আয় বাস্তব অর্জনের চেয়ে প্রায় ১,০০০ আন্তর্জাতিক ডলার বেশি হতে পারত।

Modi Government India Economy Report

গবেষক কেভিন ও রবিন গ্রিয়ার তাঁদের পেপারে অর্থনীতিবিদদের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ‘সিন্থেটিক কন্ট্রোল মেথড’ (Synthetic Control Method) ব্যবহার করেছেন। বাস্তব পৃথিবীতে একই সাথে মোদী জমানা এবং মোদী-বিহীন জমানা সমান্তরালভাবে পরীক্ষা করা সম্ভব নয়। তাই ১৯৮৪ থেকে ২০১৩ সাল—এই দীর্ঘ ৩০ বছরের ভারতের অর্থনীতির গতির সাথে বিশ্বের অন্যান্য উদীয়মান অর্থনীতির তুলনা করে গবেষকেরা একটি কৃত্রিম বা গাণিতিক ‘সিন্থেটিক ইন্ডিয়া’ (Synthetic India) গঠন করেন।

এই কৃত্রিম মডেলে তথ্য সংগ্রহের ভিত্তি ছিল দুইটি আন্তর্জাতিকভাবে নির্ভরযোগ্য উৎস:

  1. অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচক: মাথাপিছু আয় ও অর্থনৈতিক ডেটার জন্য ব্যবহার করা হয়েছে বিশ্বখ্যাত Penn World Table 11.0। এই কাল্পনিক ভারত তৈরিতে পাঁচটি দেশের ঐতিহাসিক বিকাশধারাকে নির্দিষ্ট অনুপাতে যুক্ত করা হয়—ইথিওপিয়া (৩৮%), চীন (২৮%), বাংলাদেশ (২৫%), পাকিস্তান (৭%) এবং ফিলিপাইন (২%)। এই সংমিশ্রণটি ২০১৪-পূর্ববর্তী ৩০ বছর ধরে ভারতের মূল অর্থনীতির গতিপথের সাথে প্রায় ১%-এরও কম পার্থক্যে নিখুঁতভাবে মিলে গিয়েছিল।

  2. গণতন্ত্র ও সুশাসনের সূচক: প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র পরিমাপ করতে সুইডেনের গোথেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত V-Dem (Varieties of Democracy) Institute-এর উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। সুশাসনের মডেল তৈরিতে ১২টি উদীয়মান গণতান্ত্রিক দেশকে যুক্ত করা হয়েছিল।

মাথাপিছু আয় এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ

গবেষণায় এটি স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ২০১৪ সালের পর ভারতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়ে গেছে—এমনটি নয়। তবে মোদী সরকারের জমানায় অর্থনীতির গতিধারা আগের ৩০ বছরের স্বাভাবিক ধারার (Business-as-usual trajectory) চেয়ে উল্লেখযোগ্যভাবে ধীরগতির ছিল।

  • আয়ের ব্যবধান: গবেষণার হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সাল নাগাদ ভারতের প্রকৃত মাথাপিছু আয় কাল্পনিক ‘সিন্থেটিক ইন্ডিয়া’র চেয়ে প্রায় ১০ শতাংশ কম ছিল। ভারতীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ প্রতি নাগরিক পিছু বার্ষিক প্রায় ১,০০০ আন্তর্জাতিক ডলার।

  • অর্থনৈতিক ক্ষতির সামগ্রিক প্রভাব: কিছু অর্থনীতিবিদ মনে করছেন, ২০১৬ সালের নোট বাতিল (Demonetisation), জিএসটির তাড়াহুড়ো রূপায়ণ এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ ও পারিবারিক সঞ্চয় রেকর্ড নিচে নেমে যাওয়া এই ঘাটতির পেছনে বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

গণতন্ত্র ও সুশাসনের ১০টি সূচকের চরম অবক্ষয়

অর্থনৈতিক ঘাটতির পাশাপাশি V-Dem ইনস্টিটিউটের ১০টি প্রধান গণতান্ত্রিক অধিকার ও সুশাসন সূচকের প্রতিটিতেই কাল্পনিক ধারার চেয়ে বাস্তব ভারত অনেক নিচে অবস্থান করছে বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে:

  • নির্বাচনী ও উদার গণতন্ত্র: মডেলের সম্ভাব্য ধারার তুলনায় ভারতের নির্বাচনী গণতন্ত্রের সূচক প্রায় ৬০.২% এবং উদার গণতান্ত্রিক সূচক ৬৯.১% পিছিয়ে পড়েছে।

  • রাজনৈতিক দুর্নীতি: কাল্পনিক মডেলের তুলনায় দেশে রাজনৈতিক দুর্নীতির মাত্রা প্রায় ৪৬.৮% বৃদ্ধি পেয়েছে বলে মডেলে দেখা গেছে।

  • নাগরিক ও স্বাধীনতা সূচক: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সূচক ৫৬.২% কম এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার সূচক প্রায় ১৬৮.৭% কম চিহ্নিত করা হয়েছে, যা ১০টি সূচকের মধ্যে সবচেয়ে বড় ফারাক।

  • আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ: আইনের সমতা (৩০.৪% ঘাটতি), সমান সুরক্ষার অধিকার (২৬.১% ঘাটতি) এবং বিচারবিভাগ ও আইনসভার মাধ্যমে নির্বাহী ক্ষমতার লাগাম টানার সূচকেও অবনমন দেখা গেছে।

পদ্ধতির স্বচ্ছতা বজায় রাখতে গবেষকেরা তাঁদের সমস্ত ডেটা panel এবং Stata কোড GitHub Replication Repository-এ সবার পরীক্ষার জন্য উন্মুক্ত রেখেছেন।

আরও পড়ুন: এস-৫০০ ও সু-৫৭ ভারতে পাঠাতে মস্কোর মেগা অফার: পুতিন-মোদী বৈঠকে বড় খবর

ভারত সরকার ও নীতি-বিশ্লেষকদের প্রতিক্রিয়া

এই Modi Government India Economy Report সোশ্যাল সাইন্স রিসার্চ নেটওয়ার্কে (SSRN) প্রকাশিত হওয়ার পরেই ভারতে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ভারতের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের (I&B Ministry) বিশেষ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কাঞ্চন গুপ্ত সহ বেশ কয়েকজন সরকারি নীতি-বিশ্লেষক এই গবেষণার পদ্ধতি নিয়ে কড়া প্রশ্ন তুলেছেন।

সরকারপক্ষের যুক্তিতে বলা হয়েছে, ইথিওপিয়া বা পাকিস্তানের মতো সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থনৈতিক কাঠামোর দেশের উপাত্ত মিশিয়ে একটি কৃত্রিম ‘সিন্থেটিক ইন্ডিয়া’ তৈরি করে ভারতের গত এক দশকের ডিজিটাল বিপ্লব, ভৌত পরিকাঠামো নির্মাণ এবং অভূতপূর্ব কাঠামোগত পরিবর্তনকে অস্বীকার করা হয়েছে।

তবে গবেষক এবং নিরপেক্ষ অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে:

১. গবেষণাপত্রটি বর্তমানে একটি ওয়ার্কিং পেপার (Working Paper), যা বৈজ্ঞানিক নিয়মানুযায়ী এখনও পিয়ার রিভিউ (Peer Review) প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

২. ‘সিন্থেটিক কন্ট্রোল’ একটি স্বীকৃত গাণিতিক পরিসংখ্যান পদ্ধতি হলেও, অতীতে মোদী না থাকলে ভারতের পরিস্থিতি ঠিক কী হতে পারত—তা ১০০% অকাট্যভাবে প্রমাণ করা বাস্তবিকভাবে অসম্ভব।

প্রশাসনিক পরিকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি দেশের প্রকৃত অগ্রগতি শুধু দেশের মোট জিডিপি (GDP) বা বহুতল ও মহাসড়কের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা, সুশাসন এবং নাগরিকের জীবনের মানও প্রবৃদ্ধির সমান অংশীদার। ১০ বছর অতিক্রম করার পর আন্তর্জাতিক গবেষণায় উঠে আসা এই তথ্য ভারতের অর্থনৈতিক এবং প্রশাসনিক বৃত্তে দীর্ঘস্থায়ী ভাবনার জোগাণ দেবে।

By Tanmay

তন্ময় ‘প্রাইমইনসাইট’ (PrimeInsight)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান লেখক। কলকাতা-ভিত্তিক একজন উৎসাহী ব্লগার ও স্বতন্ত্র ভাষ্যকার হিসেবে তিনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর তীক্ষ্ণ ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরেন। সঙ্গীত, সমসাময়িক ঘটনাপ্রবাহ এবং রাজনীতি—এই ক্ষেত্রগুলোতে গভীর জ্ঞানের অধিকারী ইন্দ্রজিৎ তাঁর লেখায় সাংস্কৃতিক উপলব্ধির সাথে রাজনৈতিক বিশ্লেষণের সমন্বয় ঘটান। জাতীয় ও বৈশ্বিক ঘটনাবলির সাথে সংযোগ বজায় রাখার পাশাপাশি তাঁর লেখায় কলকাতার বৌদ্ধিক ও শৈল্পিক সত্তার প্রতিফলনও ফুটে ওঠে।

Leave a Reply

Enable Notifications No Allow